29 C
ঢাকা, বাংলাদেশ
রাত ৮:০৮ | ২০শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই ফাল্গুন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
গ্রীন পেইজ
ওজন গর্ত – এক বিস্ময়কর আবিস্কার এবং পৃথিবীর বেঁচে যাওয়া
পরিবেশ গবেষণা সাদিয়া নূর পর্সিয়া

ওজন গর্ত (Ozone hole) – এক বিস্ময়কর আবিস্কার এবং পৃথিবীর বেঁচে যাওয়া

ওজন গর্ত (Ozone hole) ওজন গর্ত – এক বিস্ময়কর আবিস্কার এবং পৃথিবীর বেঁচে যাওয়া

– রহমান মাহফুজ ও
মোহাম্মদ কায়ছার আলী

এইতো কয়েক দশক আগে ক্রমবর্ধমান জলবায়ু সংকট হিসেবে ওজন স্তরের একটি বিশাল গর্ত বিশ্বকে নাড়া দিয়েছিল যার কারণে প্রতিবাদেরও ঝড় উঠেছিল। বিশ্ব জলবায়ুর এই পরিবর্তন অবলোকন না করলে ভবিষ্যতের দিনগুলি হয়তো আরও উষ্ণ হত।

ওজন গর্ত (Ozone hole) অবলোকন এবং ধংসের থেকে বেঁচে গেছে পৃথিবী

ওজন গর্ত (Ozone hole) আবিস্কারের ফলে বিশ্ব ওজন স্তরের গুরুত্ব, উহার গঠন ও ধ্বংসের কারণ বিষয়ে বিশ্ব বিষদভাবে জানলো এবং ধ্বংসের কারণগুলো প্রতিরোধে সোচ্চার হল।

ওজন (O3) একটি অক্সিজেন(O2) অণু যা কিনা ক্ষতিকর অতিবেগুনী আলোর নির্দিষ্ট তরঙ্গ দৈর্ঘ্যকে শোষণ করে। বায়ুমণ্ডলে এর অবস্থান ভূ-পৃষ্ঠ হতে ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটার (১২ থেকে ১৯ মাইল) এর মধ্যে। বায়ু মন্ডলের বর্ণিত স্থানে ওজন এমন একটি স্তর তৈরি করে যা সূর্য হতে পৃথিবীতে আসা আলোক রস্মির ক্ষতিকারক প্রভাবগুলি শোষণ করে জীবমণ্ডল রক্ষা করতে সহায়তা করছে। পাশাপাশি পৃথিবীর উষ্ণায়ন রোধ করছে।ওজন স্তর খুবই হালকা এবং ইহা অস্থিতিশীল- ওজন(O3) স্তর ক্রমাগতভাবে ভাঙছে আর গড়ছে। আসলে ওজনই অস্থিতিশীল অর্থাৎ তৈরী হচ্ছে আর ভাঙছে, তাই ওজন স্তরও অস্থিতিশীল।

বায়ুমণ্ডলের উপরিভাগে সৌর বিকিরণের উপস্থিতিতে উত্তেজিত এলাকায় (O*, O+, O2*) বিভিন্ন প্রজাতির অক্সিজেন বিদ্যমান। ওজোন গঠনের জন্য এই প্রজাতিগুলি N2 বা ধাতব অক্সাইডের মতো অন্যান্য রাসায়নিক এজেন্টগুলির উপস্থিতিতে বিভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায় এবং নিন্ম বর্ণিত রাসায়নিক বিক্রিয়ায় ওজন (O3) গঠিত হয়:-

O2 + hν (240 মিলি মিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্য) → O + O
O2 + O + (M) → O3 + M

যেখানে M = N2, ধাতব অক্সাইড(বায়ুমণ্ডলে উপস্থিত অনুঘটক হিসাবে কাজ করে)। এই এজেন্টগুলি ওজোন গঠনের স্থিতিশীল করতে অতিরিক্ত শক্তি হ্রাস করে।

(ওজন (O3) মন্ডল দুই স্তরে বিদ্যমান। ভূ-পৃষ্ঠ হতে ১০-১৫ কিঃমিঃ পর্যন্ত উচ্চতায় যে ওজন বিদ্যমান তা হলো ভূ-পৃষ্ঠ সংলগ্ন ওজন (Ground level, O3 ইহা খুবই বিপদজনক বায়ুদূষন, যার ফলে ভূ-পৃষ্ঠে Photochemical smog তৈরী হয়। Photochemical smog হলো বিষাক্ত গ্যাস যা প্রানী ও উদ্ভিদের জীবন হানী ঘটাতে পারে।)

ওজন স্তরের ওজন ধংসকারী গ্যাসসমূহ হল নাইট্রিক অক্সাইড(NO2), হাইড্রোক্সিল র‌্যাডিকাল (OH), এবং ক্লারোফ্লোরো কার্বন (CFCl3)।

ওজন গর্ত (Ozone hole) অবলোকন এবং ধংসের থেকে বেঁচে গেছে পৃথিবী
ওজন গর্ত (Ozone hole) অবলোকন এবং ধংসের থেকে বেঁচে গেছে পৃথিবী

বায়ুমন্ডলে ওজনকে এ গ্যাসগুলো যে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে ধ্বংস করছে তা হল :-

(১) নাইট্রিক অক্সাইড(NO2)এর সাথে বিক্রিয়া:
O2 + hν (240 মিলি মিটার তরঙ্গদৈর্ঘ্য) → O + O
O3 + NO → NO2 + O2
NO2 + O → NO + O2

(২) হাইড্রোক্সিল র‌্যাডিকাল (OH)বিক্রিয়া:-
H2O + hν → OH + O-
O3 + O- → O2 + O2
O3 + OH = O2 + HOO- (পার অক্সাইড র‌্যাডিক্যাল)
Hoo- + O- → OH + O2

(৩) ক্লোরোফ্লোরো কার্বন (CFCl3 or CFCs)র প্রতিক্রিয়া
CFCl3 + hν → CFCl2 + Cl. (hv = 240 nm wave length)
Cl. + O3 → ClO. + O2
ClO. + O → Cl . + O2.

এ প্রতিক্রিয়া একটি চক্র, প্রতিটি Cl – র‌্যাডিক্যাল ১,০০,০০০ ওজন (O3) অণুকে সরিয়ে ফেলতে পারে।

এটি সর্বশেষ তত্ত্ব যার জন্য একজন জার্মান এবং দুই আমেরিকান বিজ্ঞানীকে, বায়ুমণ্ডলীয় রসায়নে ১৯৯৫ সালে নোবেল পুরষ্কার দেওয়া হয়েছিল ।ক্লোরোফ্লোরো কার্বন (CFCl3 or CFCs) এক প্রকার কম ফুটন্ত দ্রাবক জাতীয় কৃত্রিম ভাবে তৈরী গ্যাস যা শীতলকরন যন্ত্র যেমন ফ্রীজ, এয়ারকন্ডিশনে এবং এরোসোলে ফ্রিয়ন (Freon) গ্যাস হিসাবে ব্যবহার হয়ে আসছে। এই গ্যাসটি তৈরি হওয়ার পরে এটি দ্রুত বায়ুমণ্ডলে পৌঁছে। ইহার অনু খুবই শক্তিশালী, এ গ্যাস ওজন স্তরের ওজনকে ধ্বংস করে তাতে গর্তের (Ozone hole) সৃষ্টি করে যার মাধ্যমে সূর্যের আল্ট্রাভায়লেট রশ্মি সরাসরি পৃথিবীতে পৌঁছায়, যা পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে স্কীন ক্যানসারসহ নানাবিধ জটিল রোগের কারণ হয়।

অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস যথা কার্বন ডাই অকসাইড (CO2) নাইট্রাস অক্রাইড (N2O), মিথেন (CH4) তুলনায় ক্লারোফ্লোরো কার্বন বিশ্ব উষ্ণতা জন্য অত্যন্ত ভাবে দায়ী। ক্লোরোফ্লোরো কার্বনের অনু খুবই শক্তিশালী। এক অনু ক্লোরোফ্লোরো কার্বন এক অনু কার্বনডাইঅক্সাইড হতে ৩,৮০,০০,০০০ গুণ, এক অনু মিথেন হতে ১৫,২০,০০০ গুণ এবং এক অনু নাইট্রাস অক্সাইড হতে ১০,০০০ গুণ শক্তিশালী।

ওজন স্তরের ওজন ধ্বংসকারী অন্যান্য গ্যাস সাথে ক্লোরোফ্লোরো কার্বন উৎপাদন ও ব্যবহার সীমিতকরণের নিমিত্তে ১৯৮৭ সালে জাতীসংঘের উদ্যোগে মন্ট্রিল প্রটোকল স্বাক্ষরিত হয়। তখন হতে উন্নত দেশগুলোতে ক্লোরোফ্লোরো কার্বন এর ব্যবহার বর্তমানে শুণ্যের কোটায় নেমে এসেছে। আমাদের মত দেশগুলোতেও ধীরে ধীরে ব্যবহার সীমিত হয়ে আসছে।

ওজন গর্ত (Ozone hole) অবলোকন এবং ধংসের থেকে বেঁচে গেছে পৃথিবী

গবেষনায় দেখা গেছে, মন্ট্রিল প্রটোকলের ফলে গত দুই দশকে উত্তর ও দক্ষিন মেরুতে সৃষ্ট ওজন গর্তের আকৃতি ক্রমশই হ্রাস পাচ্ছে। অধিকন্তু ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির যে ধারণা করা হয়েছিল তার থেকে তাপমাত্রা অন্তত এক ডিগ্রি সেলসিয়াস শীতল হওয়ার আশা জাগিয়েছে।

এই এক ডিগ্রি তো অনেক দূরে। যখন এমন সব দশক গুলি আসতে থাকবে যেখানে মাত্র ২ ডিগ্রী আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে ভাবিয়ে তুলবে যা পুর্বের কয়েক হাজার বছরেও দেখা যায়নি। আর ইহার কারণেই পৃথিবীতে অনেকগুলি ধ্বংসাত্মক পরিণতি যেমন, বন্যা, খরা, মারাত্বক গরম, শৈত্য প্রবাহ, ঘূর্ণিঝড়, ভূমি ধ্বস ইত্যাদি প্রাকৃতিক দূর্যোগ ঘটতে থাকবে।

ফলে নিদ্ধিায় বলা যায়, ১৯৮৯ সালের ‘মন্ট্রিল প্রোটোকল’ ওজোন স্তর বাচানোর জন্য একটি যুগান্তকারী চুক্তি। সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলস (UNSW) এর গবেষকরা বিশ্ব জলবায়ু মডেলের সাথে একত্রে সিমুলেশন ব্যবহার করে বিভিন্ন জলবায়ুর দৃশ্যের মূল্যায়ন করেছেন। যেখানে দেখানো হয়েছে যে, এ চুক্তি ও ইহার বাস্তবায়ন যদি না হত তবে আজকের পৃথিবীর চেহারা কেমন লাগত।

তাদের প্রাথমিক লক্ষ্যটি ছিল ওজোন-ক্ষয়কারী রাসায়নিকগুলির একটি বিষাক্ত ফোটা কীভাবে অ্যান্টার্কটিকের বায়ুমণ্ডলীয় সঞ্চালনকে প্রভাবিত করেছিল। গবেষণার মাধ্যমে তারা এমন একটি বিশ্ব কল্পনা করে যেখানে প্রতি বছর CFC প্রায় ৩ শতাংশ হারে বৃদ্ধি অব্যাহত রেখেছে – এমন একটি হার যা বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে পৃথিবীর আবস্থা দাড়াবে।

বিশ শতকের শুরুর দিকে ওজোন-ক্ষতিকারক যৌগগুলি বায়ুমণ্ডলে বিশেষ করে বিশেষত পৃথিবীর নীচের প্রান্তে এক বিপর্যয়কর প্রভাব ফেলেছিল। ১৯৮৫ সালে বিশ্ব নেতারা ওজোন স্তর সংরক্ষণের জন্য ভিয়েনা কনভেনশনে স্বাক্ষর করার জন্য একত্রিত হন, এটি একটি প্রতিশ্রুতি যা পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে ওজোন-ধ্বংসকারী রাসায়নিকের উৎপাদন প্রক্রিয়া বন্ধ করার জন্য নকশাকৃত একটি প্রোটোকলের রূপ গ্রহণ করে।

তিন দশক পরে, বায়ুমণ্ডলের একটি প্রতিরক্ষামূলক বিভাগের জন্য স্তরের ফাঁকা স্থানটি পুরটাই সমস্ত অদৃশ্য হয়ে গেছে। (নিচে এই বিষয়ে অস্ট্রেলিয়ান একাডেমি অফ সায়েন্সেসের ক্লিপটির কিছু অংশ পড়া যেতে পারে।)

“এটা ছিল অতি মূল্যবান সাফল্যের একটি গল্প। যদিও মুষ্টিমেয় দুর্বৃত্তরা এখনও দূষণকারীকে ছড়িয়ে দিচ্ছে। মন্ট্রিয়ায় স্বাক্ষরিত চুক্তিটি সেক্ষেত্রে একটি উদাহরণ হতে পারে। একটি টেকসই ভবিষ্যতের জন্য মানবতা কী অর্জন করতে পারে তার একটি নিখুঁত উদাহরণ হিসাবে চুক্তিটি বিবেচিত হতে পারে।“

UNSW-এর জলবায়ু বিজ্ঞানী রিষাভ গোয়েল বলেন, “কার্বন-ডাই-অক্সাইডের থেকে CFC গ্যাস হাজার হাজার গুণ বেশি শক্তিশালী, তাই মন্ট্রিল প্রোটোকল কেবল ওজোন স্তরটিই সংরক্ষণ করেনি, বরং এটি বৈশ্বিক উষ্ণতা যথেষ্ট পরিমাণকে হ্রাস করেছে ।

এটি মেরুবাসীদের জন্য বিশেষ দুর্দান্ত খবর। ওজোন গর্তটি পূরণের জন্য পদক্ষেপ নেওয়া না হলে, এই গ্রিনহাউস গ্যাসগুলি এই শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে মেরু অঞ্চলের তাপমাত্রার 4° ডিগ্রি অবধি উপরে উঠত। এখনও CFCর উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এবং এর কারণে এথনও উত্তর মেরুর চারপাশে গ্রীষ্মের বরফ ঠিক আগের মতো হয় না। গবেষকদের মতে বরফের ২৫ শতাংশ বেশি এখনও মানব সৃষ্ট CFC দ্বারা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

UNSW সমুদ্রবিদ ও জলবায়ু বিজ্ঞানী ম্যাথু ইংল্যান্ড বলেছেন, “মন্ট্রিল ইতোমধ্যে সিএফসি’র নি:সরণ নিয়ন্ত্রন করে ফেলছে । তাই পরবর্তি বড় লক্ষ্য হল কার্বন ডাই অক্সাইডের নির্গমনকে একেবারে শূন্যের কোটায় নিয়ে আসা” ।

ওজন গর্ত (Ozone hole) অবলোকন এবং ধংসের থেকে বেঁচে গেছে পৃথিবী
ওজন গর্ত (Ozone hole) অবলোকন এবং ধংসের থেকে বেঁচে গেছে পৃথিবী

অন্যদিকে ২০৫০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা মাত্র এক ডিগ্রি কমিয়ে তাপমাত্রা হ্রাস করার লক্ষ্যে কিয়োটো প্রোটোকলটির উপরে কিছু বাধা নিষেধ আছে। কারণ ২০১২ সালে কানাডা এ চুক্তি হতে বেড়িয়ে যায় এবং আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র কিয়োটো প্রোটোকল এর ধারাবাহিক ২০১৪ সালের প্যারিস চুক্তি হতে বের হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। তবে সুদিন আর বেশি দূরে নয়। বৈশ্বিক রাজনীতির ইতিহাসে যদি কারো পাঠ থাকে তবে তাদের কাছ থেকে শেখার সময় এখনই।

ম্যাথু ইংল্যান্ড বলেন “মন্ট্রিল প্রোটোকলের সাফল্য গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকে সীমাবদ্ধ করার আন্তর্জাতিক অন্য সকল চুক্তিগুলি সত্যই কার্যকর করে; তারা আমাদের জলবায়ুকে খুব অনুকূল উপায়ে প্রভাবিত করতে পারে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিপজ্জনক মাত্রা এড়াতে আমাদের সহায়তা করতে পারে”।

Sources:
1. Australian Academy of Sciences
2. Environmental Research Letters.
3. Atmospheric Pollution, History, Science and Regulation, Mark Z. Jacobson, Cambridge Uni. Press, 2003
4. Environment: Problems and Solutions, DK Asthana, Meera Asthana, Chand Pub. India, 1999.
5. Environmental Chemistry, AK De, 4th Edition, New Age International (Pvt)Ltd,India, 2000
6. Air Pollution, MN Rao, HVN Rao, Tata-McGraw-Hill , India,1989.

সম্পর্কিত পোস্ট

একটি মন্তব্য দিন

Green Page | Only One Environment News Portal in Bangladesh
Bangladeshi News, International News, Environmental News, Bangla News, Latest News, Special News, Sports News, All Bangladesh Local News and Every Situation of the world are available in this Bangla News Website.

এই ওয়েবসাইটটি আপনার অভিজ্ঞতা উন্নত করতে কুকি ব্যবহার করে। আমরা ধরে নিচ্ছি যে আপনি এটির সাথে ঠিক আছেন, তবে আপনি ইচ্ছা করলেই স্কিপ করতে পারেন। গ্রহন বিস্তারিত