30 C
ঢাকা, বাংলাদেশ
রাত ১:০২ | ১১ই জুলাই, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ২৭শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
গ্রীন পেইজ
ভিকারুন্নেসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ গভর্নিং বডি’র নির্বাচন এবং পরিবেশ দূষণ
পরিবেশ বিশ্লেষন রহমান মাহফুজ

ভিকারুন্নেসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ, ঢাকা’র গভর্নিং বডি’র নির্বাচন এবং পরিবেশ দূষণ

ভিকারুন্নেসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ, ঢাকা’র গভর্নিং বডি’র নির্বাচন এবং পরিবেশ দূষণ

রহমান মাহফুজ, প্রকৌশলী, পরিবেশ কর্মী, পরিবেশ এবং পরিবেশ অর্থনৈতিক কলামিষ্ট, সংগঠক এবং সমাজসেবী।

গত ২৫ অক্টোবর, ২০১৯ তারিখে ভিকারুন্নেসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ, ঢাকা‘র গভর্নিং বডির নির্বাচন হয়ে গেল। খুবই স্বতঃর্ম্ফূত জাকজমকপূর্ণ নির্বাচন। এমন ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রতিদ্ব›দ্বীতামূলক নির্বাচন সাধারণতঃ চোখে পড়ে না। গণতান্ত্রিক ধারায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডির নির্বাচনের এমন স্বতঃর্ম্ফূত নির্বাচনের তারিফ করতেই হয়। ভিকারুন্নেসা নূন স্কুল এন্ড কলেজ কর্তৃপক্ষ এরূপ একটা নির্বাচনের আয়োজন করবার জন্য ধন্যবাদ প্রাপ্য। শুধু ভিকারুন্নেসা কেন? ঢাকার সকল বেসরকারী স্কুল ও কলেজের গভর্নিং বডি’র নির্বাচন খুবই প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ হয়ে আসছে।

কয়েক মাস পূর্বে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজের নির্বাচন প্রায় এ রকমই প্রতিদ্বন্দ্বীতাপূর্ণ হয়েছিল। প্রার্থীগণের আত্বীয়-স্বজন ব্যবসা-বাণিজ্য রেখে, চাকুরিতে ছুটি নিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে দিনরাত ভোট ভিক্ষা চেয়েছেন। এমন কথাও শোনা গেছে যে, কোনো কোনো প্রার্থীর আত্বীয়-স্বজন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে তো বটেই, বিদেশ থেকেও ছুটি নিয়ে ঢাকায় আসেন প্রার্থীর প্রচার কাজে অংশ গ্রহণের জন্য। ভিকারুন্নেসার নির্বাচনেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। নির্বাচনের ৬(ছয়) মাসে পূর্ব থেকেই প্রাথীরা মাঠে নেমে পড়েছিলেন। দুই মাস পূর্বেই প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি ক্যাম্পাসের আশপাশতো বটেই ২৫/৩০ বর্গ কিলোমিটার পর্যন্ত পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে গিয়েছে।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার বহু পূর্ব থেকেই ছোট বড় রঙিন পোস্টার এবং তফসিল ঘোষণার পর সাদা-কালো পোস্টার আর পোস্টার। দেয়ালে দেয়ালে, রোডের পাশে, মাথার উপরে রশি দিয়ে ঝুলিয়ে, ফ্লাইওভারের পিলারে পিলারে, তলদেশে শুধুই পোস্টার।

কোনো কোনো পোস্টার আবার দেয়াল সাইজের। নির্বাচনের মাস খানিক আগে থেকে প্রার্থীর পক্ষে দল বেঁধে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে ক্লাশ শুরুর পূর্বে ও ছুটির পর প্রার্থীর পক্ষে প্রচার, সন্ধ্যার পর বাড়ি-বাড়ি ফ্লাটে-ফ্লাটে ভোট ভিক্ষা- এ যেন এক এলাহী কান্ড।

ভোটের দিনে তো বিশাল উৎসব। সড়কের ফুটপাত জুড়ে প্রার্থীদের বিশাল বিশাল প্যান্ডেল। প্যান্ডেল আবার পরিপূর্ণ নানা বয়সী নারী -পুরুষ দ্বারা, চা-নাস্তা -বিরানী খাওয়ার কোন কমতি নাই। শুশ্রী সুসজ্জিত নারীরা ও হ্যান্ডসাম পুরুষেরা প্রার্থীদের জন্য ভোট চাচ্ছে।

আবার কোনো কোনো প্রার্থীর নির্বাচনী কর্মীদের জন্য ষ্পোশাল ইউনিফর্ম। ভোটার তো বটেই কোনো পথচারীও যদি ক্যাম্পাসের আশে পাশে এসছে তো মরেছে, তাকে ধরে টানাটানি, দাদা-ভাই বোন-আপা চাচা-চাচী সম্বোধন করে স্বস্ব প্রার্থীর পক্ষে ভোট দিতে নিয়ে যাবার জন্য টানাটানি।

এরূপ গণতান্ত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বীতা কোনো জাতীয় নির্বাচনে বর্তমানে বা অতীতেও কারো চোখে পড়েছে কিনা সন্দেহ। শিক্ষানুরাগী- সমাজহীতকর কাজের জন্য সুযোগ সন্ধানী মানুষের যে আজও অভাব নাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি’র নির্বাচন তারই প্রমাণ।




তবে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি’র এরূপ নির্বাচনে বাড়াবাড়ি সাধারণতঃই প্রশ্নের জন্ম দেয়, অবৈতনিক এ কমিটির নির্বাচিত প্রতিনিধি হওয়ার জন্য এত কিছু কেন? নির্বাচনের মাঠে দিন রাত ছুটাছুটি আর কাড়ি-কাড়ি টাকা ব্যয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি’র সদস্য নির্বাচিত হয়ে কি লাভ?

দেখা যাচ্ছে, যে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠনে ছাত্র-ছাত্রী ভর্তিতে যত বেশী প্রতিদ্বন্দীতাপূর্ন সে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি’র নির্বাচন তত বেশী প্রতিদ্বন্দীতাপূর্ন। অনেকই হয়ত বলতে পারেন শিক্ষানুরাগী হিসাবে, সমাজসেবা, জনসেবার জন্যই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি’র প্রতিনিধি হতে এরূপ দৌঁড় ঝাপ।

কিন্তু একই সমাজে মসজিদ কমিটিতে, সমাজ উন্নয়ন কমিটিতে তো কাউকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতিনিধি হতে বা অংশগ্রহণ করতে দেখা যায় না। বর্তমানে কিশোর ও যুবকশ্রেণির মধ্যে সমাজহীতকর সাংগঠনিক কর্মকান্ড কিছুটা চোখে পড়লেও, বয়স্কদের মাঝে তদরূপ কোনো কর্মকান্ডই চোখে পড়ে না।

আবার কেউ কেউ বলতে পারেন যে রাজনৈতিকভাবে পরিচিত হওয়ার জন্যই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের গভর্নিং বডি’র নির্বাচনে এমনভাবে অংশগ্রহণ। কিন্তু তাও না, কারণ নির্বাচনে পেশাজীবী, চাকুরীজীবীরাও অংশ গ্রহণ করছেন এবং নির্বাচিতও হচ্ছেন।

এছাড়াও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা যে শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ঠ এলাকার বা সংসদীয় আসনের তাও নয়, ভিন্ন ভিন্ন এলাকা বা সংসদীয় আসনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। আবার, কোনো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একাধিক ক্যাম্পাসও রয়েছে, যেগুলো অনেক দূরে দূরে বিভিন্ন সংসদীয় আসনে আসনে ছড়িয়ে ছিটিয়ে।

যেমন, ভিকারুন্নেসা ও মতিঝিল আইডিয়ালের ৩টি করে ক্যাম্পাস রয়েছে একটি অন্যটি থেকে অনেক দুরে। তাহলে কি এত টাকা পয়সা খরচ করে, এত যুদ্ধ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি’র প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়ার পিছনে বিশেষ কোনও সোনার খনি প্রাপ্তির সম্ভাবনা লুকিয়ে রয়েছে?

জনশ্রুতি রয়েছে যে, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভর্তি বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য, ছাত্রছাত্রীদের (মূলতঃ অসহায় অভিাবকদের) নিকট থেকে আদায়কৃত মাত্রাতিরিক্ত বেতন ও নানা ধরনের চাঁদার ভাগ বাটোয়ারা প্রাপ্তিই হলো সোনার হরিণ প্রাপ্তির সমতুল্য। কারণ, বেশীরভাগ বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের নিকট থেকে যে বেতন এবং নানা অজুহাতে যে সকল বাড়তি ফি নেয়া হয়, তার কোন সঠিক হিসাব নিকাশ নেই।

আর ভর্তি বাণিজ্য, নিয়োগ বাণিজ্য তো রয়েছে, এ সকল স্কুলে এক একটি ছাত্র/ছাত্রী ভর্তিতে নাকি ৪/৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত দালালী নিতে শুনা যায়, তার সাথে রয়েছে শিফটিং ও শাখা পরিবর্তনের বিষয়টি, আল্লাহই জানেন আসল সত্য কি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা কোমল মতি শিশুদের উপর থেকে পরীক্ষার নামে অযথা চাপ কমানোর জন্য পরীক্ষা বাতিল করে লটারীর মাধ্যমে ভর্তির নির্দেশ দিয়ে ছিলেন। এতেই নাকি একে বারে পোয়াবারো। পূর্বে তবু অবৈধ পথে ভর্তি করানোর জন্য অন্ততঃ ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি পরীক্ষার প্রবেশ পত্রের প্রয়োজন হতো, এখন তো তাও লাগে না। আর লটারির নামে নাকি প্রতারণা চলছে। লটারির নির্ধারিত তারিখে নাকি কেনো কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুটি কয়েক ছাত্র ছাত্রীর নির্বাচন সম্পন্ন করে।

তারপর একই শ্রেণিতে বিভিন্ন শাখায় হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী ভর্তি করানো হয় অবৈধ উপায়ে। এরূপ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একেকটি ক্লাসে বা সমগ্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রকৃত পক্ষে কতজন ছাত্রছাত্রী রয়েছে তা সাধারণেরও অজানা। আবার লটারির মাধ্যমে যে গুটি কতক ছাত্রছাত্রী নেয়া হয় তারমধ্যেও বিভিন্ন কারসাজির কথা শোনা যায়, যেমন-কাকে কাকে নেয়া হবে তাদের নামই নাকি শুধু গুটিতে বা কাগজে আগ থেকেই লিখে রাখা হয় বা কত নম্বর গুটি উঠলে কে হাত তুলবে তা আগে থেকে নির্ধারণ করে দেয়া হয়, কত টুকু সত্যি আল্লাহমালুম।

মূলতঃ এসকল নিয়ে এ লেখার উদ্দেশ্য নয়। এ লেখার উদ্দেশ্য হলো শিক্ষ প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি’র নির্বাচনে মারাত্মক পরিবেশ দূষণ নিয়ে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি’র নির্বাচনে যে এত পোস্টারের ব্যবহার, ছড়াছড়ি তা নিয়ে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদেরকে যেখানে পরিবেশ, পরিবেশ দূষণের কারণ এবং দূষণ প্রতিরোধে সচেতনাতা গড়ে তোলা হয়, সেখানে এরূপ প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটির মত অবৈতনিক পদে নির্বাচনের নামে দেশের অর্থ-সম্পদ ও জনশক্তির অপচয়সহ এত ব্যাপকভাবে পরিবেশ দূষণ কিছুতে মেনে নেয়া যায় না।

২৫/১০/২০১৯ খ্রিঃ তারিখ নির্বাচন হয়ে গেলেও এখনও দেয়ালে দেয়ালে, রাস্তায় রাস্তায় নির্বাচনী পোস্টার রয়ে গেছে/ঝুলছে এবং নির্বাচনের পরে কয়েক দিনের বৃষ্টিতে ঝুলন্ত পোস্টার ছিড়ে/দেয়াল থেকে খসে খসে রাস্তায় পড়ছে এবং পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে। আর পোস্টার ছাপাতে প্রয়োজন কাগজ আর কালি। কালি মানে রঙ, রঙ মানে সীসা। সীসার প্রভাবে শিশুর মস্তিষ্কের ক্ষতি হয়, চিন্তাশক্তির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়, মানব দেহে নানা ধরনের জটিল রোগ সৃষ্টি করে।

কাগজ উৎপাদনের প্রায় ৬০% কাঁচামালই উদ্ভিদ থেকে আসে, আর উদ্ভিদ পরিবেশ থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড খাদ্য প্রস্তুতে ব্যবহার করে আমাদের পৃথিবীটাকে শীতল রাখছে, অক্সিজেন নির্গমণ করে সকল প্রাণীকে বাঁচিয়ে রাখছে।

আমদের স্মরণ রাখা আবশ্যক যে, এক রিম কাগজ উৎপাদনে ৫.৪ কেজি কার্বন ডাইঅক্সাইড উপন্ন হয় যা পৃথিবীটাকে উতপ্ত করে জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটিয়ে এ গ্রহটিতে প্রাণের অস্তিত্বকে হুমকির দিকে ঠেলে দেয়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করছে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি’র ন্যায় একটি অবতৈনিক সেবাধর্মী কাজের কমিটি গঠনে কাগজ-কালির এমন অপব্যবহার বড়ই হতাশা জনক!!

সম্পর্কিত পোস্ট

Green Page | Only One Environment News Portal in Bangladesh
Bangladeshi News, International News, Environmental News, Bangla News, Latest News, Special News, Sports News, All Bangladesh Local News and Every Situation of the world are available in this Bangla News Website.

এই ওয়েবসাইটটি আপনার অভিজ্ঞতা উন্নত করতে কুকি ব্যবহার করে। আমরা ধরে নিচ্ছি যে আপনি এটির সাথে ঠিক আছেন, তবে আপনি ইচ্ছা করলেই স্কিপ করতে পারেন। গ্রহন বিস্তারিত