বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৪ উদযাপন এবং মানবজাতির আশাবাদী আকাঙ্খা
৫ই জুন, বিশ্ব পরিবেশ দিবস।
UN এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রাম (UNEP) প্রতি বছর ৫ই জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস হিসাবে পালন করে আসছে।
১৯৭২ সালে অনুষ্ঠিত জাতসংঘের স্টকহোম মানবজাতির পরিবেশ সম্মেলন (UN Stockholm Conference on the Human Environment in 1972) কর্তৃক এ দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং এর এক বছর পরে ১৯৭৩ সালে প্রথম বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয়। এই বছর বিশ্ব পরিবেশ দিবস উদযাপনের ৫১ তম বার্ষিকী পালিত হচ্ছে৷
আমাদের চারপাশে যা কিছু আছে – জীবিত এবং নির্জীব (living and non-living elements) এবং আমাদের সাথে ও উহাদের একে অপরের সাথে যে আন্তঃযোগাযোগ/প্রতিক্রিয়া করে (interact with us and each other) এ সকল বিষয় নিয়েই মানবজাতির পরিবেশ (Human Environment)।
পরিবেশের সকল অঙ্গের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সহ-অস্তিত্ব বজায় রাখার জন্য পরিবেশ বিবর্তিত হয়। যখন এক বা একাধিক উপাদান নিয়ন্ত্রণের বাইরে প্রসারিত হয় তখন পরিবেশের ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়।
বিগত পাঁচ দশক ধরে, দিবসটি পরিবেশগত প্রচারের জন্য বৃহত্তম বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মগুলির মধ্যে একটি হয়ে উঠেছে। বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ অনলাইনে এবং ব্যক্তিগত ক্রিয়াকলাপ, র্যালী, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম এর মাধ্যমে এই দিবসে বিশ্ব পরিবেশ রক্ষায় বিশ্ববাসীর মধ্যে সচেতনেতা জাগ্রত করছে।
এ বছর বিশ্ব পরিবেশ দিবস এর প্রতিপাদ্য(Theme)টি হল “করবো ভূমি পুনরুদ্ধার, রুখবো মরুময়তা, অর্জন করতে হবে খরা সহনশীলতা – Land restoration, desertification and drought resilience)।”
ভূমি পুনরুদ্ধার হল বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধার (Ecosystem Restoration)। জাতিসংঘের ২০২১-২০৩০ পর্যন্ত সারা বিশ্বে বাস্তুতন্ত্রের সুরক্ষা এবং পুনরুজ্জীবনের লক্ষ্যে এটি একটি মূল স্তম্ভ। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-২০৩০ অর্জনের লক্ষ্যে সারা বিশ্বে বাস্তুতন্ত্রের সুরক্ষা এবং পুনরুজ্জীবনের জন্য এ দিবসটি পালিত হচ্ছে।
এ বছর পরিবেশ দিবস পালনের আয়োজক দেশ (Host Country) সৌদি আরব(The Kingdom of Saudi Arabia ) ।সৌদি আরব ভূমির মরুকরণ রোধ, খরা প্রতিরোধ এবং মরুভূমি পুনরুদ্ধার এর উপর লক্ষ্য নিবন্ধ করে বিশ্ব পরিবেশ দিবস ২০২৪ এর আয়োজক দেশ হয়েছে।
মরুকরণ মোকাবেলা সংক্রান্ত জাতিসংঘের কনভেনশন অনুসারে, মরুকরণের কারণে পৃথিবীর ৪০ শতাংশ পর্যন্ত ভূমি সম্পূর্ণরূপে অব্যবহারযোগ্য হয়ে পড়েছে, যা বিশ্বের জনসংখ্যার অর্ধেককে সরাসরি প্রভাবিত করছে এবং বিশ্বব্যাপী জিডিপির প্রায় অর্ধেক (৪৪ ট্রিলিয়ন ডলার) হুমকির মুখে পড়েছে।
২০০০ সাল থেকে খরার সংখ্যা এবং সময়কাল ২৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের জনসংখ্যার তিন-চতুর্থাংশকে ইহা প্রভাবিত করতে পারে।
২০২৪ সাল হ’ল মরুকরণ প্রতিরোধে জাতিসংঘের কনভেনশনের ৩০তম বার্ষিকী। ২০২৪ সালের ২ থেকে ১৩ ডিসেম্বর সৌদি রাজধানী রিয়াদে জাতিসংঘের কনভেনশন টু কমব্যাট ডেজার্টফিকেশন (UNCCD) এর কনফারেন্স অফ দ্য পার্টিস (COP 16) এর ষোড়শ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে।
সৌদি গ্রিন ইনিশিয়েটিভ এবং মিডল ইস্ট গ্রিন ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে সৌদি আরব জাতীয় ও আঞ্চলিকভাবে কাজ করছে এবং এটি বিশ্বব্যাপীও কাজ করছে, যেমনটি ২০২০ সালের ২১-২২ নভেম্বর সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত জি-২০ সম্মেলনে গ্লোবাল ল্যান্ড রিস্টোরেশন ইনিশিয়েটিভ গৃহীত হয়েছিল।
সৌদি আরবের মত বিশ্বে মরু করণ রোধে এই ধরনের পদক্ষেপ এবং নেতৃত্ব অত্যাবশ্যক। কারণ, বর্তমানে আমরা এ গ্রহের ৩ ধরণের সংকটের উদ্বেগজনক তীব্রতার মুখোমুখি: জলবায়ু পরিবর্তনের সংকট, প্রকৃতির সংকট এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি, দূষণ ও বর্জ্যের সংকট।
এই সংকট বিশ্বের বাস্তুতন্ত্রকে আক্রমণের মুখে ফেলে দিয়েছে। মরুকরণের ফলে বিলিয়ন হেক্টর জমি ধ্বংসপ্রাপ্ত হচ্ছে, যা বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যার খাদ্য প্রাপ্তিকে অনিশ্চয়তায় ফেলে দিয়েছে এবং বিশ্বব্যাপী জিডিপির অর্ধেককে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। এর ফলে গ্রামীণ সম্প্রদায়, ক্ষুদ্র কৃষক এবং অত্যন্ত দরিদ্ররা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কিন্তু ভূমি পুনরুদ্ধার, ভূমি ক্ষয়, খরা এবং মরুকরণের লতানো জোয়ারকে বিপরীত করতে পারে। ভূমি পুনরুদ্ধারের জন্য বিনিয়োগ করা প্রতিটি ডলার ইকোসিস্টেম পরিষেবাগুলিতে ৩০ মার্কিণ ডলার পর্যন্ত পুনরুদ্ধার করতে পারে। পুনরুদ্ধার জীবিকা বাড়ায়, দারিদ্র্য হ্রাস করে এবং চরম আবহাওয়ার প্রতি স্থিতিস্থাপকতা তৈরি করে।
পুনরুদ্ধার কার্বন সঞ্চয় বাড়ায় এবং জলবায়ু পরিবর্তনকে ধীর করে। মাত্র ১৫ শতাংশ ভূমি পুনরুদ্ধার করা হলে আরও ১৫ শতাংশ ভূমির মরু রূপান্তর বন্ধ হয়ে প্রত্যাশিত প্রজাতির বিলুপ্তির ৬০ শতাংশ পর্যন্ত এড়াতে পারে।
তবে আমাদেরকে অবশ্যই জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ভূমি ক্ষয়, খরা এবং মরুকরণের চালকদেরও শেষ করতে হবে। গত বছর বিশ্বে তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে গেছে। বিশ্বের বেশিরভাগ মানুষই এর প্রভাব অনুভব করেছে।
তাপমাত্রা বৃদ্ধি শুধু তাপদাহ অনুভত করছে না – তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ঝড়, বন্যা এবং খরার প্রকোপ মারাত্বক ও বিপর্যকরভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, মানবজাতির জীবনকে ধূর্বিসহ করে তুলছে।
ভূমি ক্ষয় সরাসরি মানুষের জীবন ও জীবিকাকে প্রভাবিত করে, পানি ও খাদ্য নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে দেয় এবং অভিবাসন ও বাস্তুচ্যুতিতে অবদান রাখে।
জলবায়ু ও পরিবেশগত সংকট এবং মানুষের গতিশীলতার উপর এর প্রভাব মোকাবেলায় রূপান্তরমূলক পরিবর্তন অর্জনের জন্য আমাদেরকে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে।
প্রতি বছর দুর্যোগের কারণে লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। ২০২৩ সালে দুর্যোগের ফলে ২৬.৪ মিলিয়ন নতুন অভ্যন্তরীণ স্থানচ্যুতি ঘটেছে (অভ্যন্তরীণ স্থানচ্যুতি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের গ্লোবাল রিপোর্ট ২০২৪)।
বিশ্বব্যাংকের মতে প্রাথমিক এবং সমন্বিত জলবায়ু ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ছাড়া, ২০৫০ সালের মধ্যে ২১৬ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ অভ্যন্তরীণ জলবায়ু অভিবাসী হয়ে উঠতে পারে। তাই এর জন্য সুদৃঢ় পদক্ষেপ জরুরি।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা না করে জমি পুনরুদ্ধার করা এক হাতে দান করা এবং অন্য হাতে কেড়ে নেওয়ার মতো হবে, তাই জি-২০ দেশগুলিকে অবশ্যই পুরো জলবায়ু এজেন্ডা জুড়ে নেতৃত্ব দেখাতে হবে – যেমন সৌদি আরব ভূমি পুনরুদ্ধারে করেছে এবং চালিয়ে যাচ্ছে।
এখন আমরা সত্যিকারে একটা আশার আলো দেখতে পারছি। কারণ, জি-২০ সম্মেলণের দেশগুলো এক বিলিয়ন হেক্টর ভূমি পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা আয়োতনে চীনের চেয়েও বড়। যদি তারা তাদের প্রতিশ্রুতি অনুসারে কাজ করে এবং সফলতা দেখাতে পারে, তবে এটি বিশাল অর্জণ হবে।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মাধ্যমে এবং আগামী ডিসেম্বরে জাতিসংঘের কনভেনশন টু কমব্যাট মরুকরণ সম্মেলনের আয়োজনের মাধ্যমে, সৌদি আরব এই পুনরুদ্ধার লক্ষ্যগুলির দিকে গতি ও পদক্ষেপ তৈরি করতে পারে, জলবায়ু পরিবর্তনের গতি কমাতে পারে, প্রকৃতিকে রক্ষা করতে পারে এবং কোটি কোটি মানুষের জীবিকা ও খাদ্য নিরাপত্তা বৃদ্ধি করতে পারে।
আর তা হবে সারা বিশ্বের মানুষের জন্য, মানবজাতির কল্যাণের জন্য।
তথ্য সূত্র: UN Environment Proramme and International Maritime Organization