28 C
ঢাকা, বাংলাদেশ
সকাল ৯:৪৩ | ৩০শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১৫ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
গ্রীন পেইজ
আন্তর্জাতিক দিবস

প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক ‘নীলাকাশের জন্য নির্মল বায়ু’ দিবস পালিত

অবশেষে, জীবনের জন্য নির্মল বায়ু’র প্রয়োজনীয়তা, বিশ্বব্যাপী প্রতিনিয়ত সংঘটিত বায়ুদূষণ, মানবজীবন ও পরিবেশের ওপর বায়ুদূষণের চরম প্রভাব এবং বর্তমান বিশ্বে বায়ুদূষণের মারাত্মক অবস্থা ও এর থেকে আশু উত্তরণের প্রয়োজনীয়তাকে স্বীকৃতি দিয়ে জাতিসংঘ ‘নীলাকাশের জন্য নির্মল বায়ু’ শীর্ষক একটি আন্তর্জাতিক দিবস নির্ধারিত করেছে। ১৯ ডিসেম্বর ২০১৯ তারিখে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৪তম অধিবেশনে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এখন থেকে প্রতি বছর ৭ সেপ্টেম্বর পৃথিবীব্যাপী উক্ত দিবস প্রতিপালিত হবে এবং ইউনাইটেড ন্যাশনস এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রাম (ইউনেপ) প্রতি বছর দিবসটি আন্তর্জাতিকভাবে পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করবে। সে হিসেবে, আজ প্রথমবারের মতো পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক ‘নীলাকাশের জন্য নির্মল বায়ু’ দিবস।

বায়ুদূষণ বর্তমান বিশ্বে প্রথম পাঁচটি মৃত্যুকারণের একটি; সারা বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৭০ লক্ষ মানুষ বায়ুদূষণের কারণে অকাল মৃত্যুবরণ করে, যা অন্য যেকোনো পরিবেশগত দূষণে সংঘটিত মৃত্যু সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি। শুধু তাই নয়, বায়ুদূষণ জনিত অসুস্থতায় মানুষের কর্মক্ষমতা বহুলাংশে হ্রাস পায় যার আর্থিক মূল্য অপরিসীম; একটি গবেষণায় দেখা যায়, ভারতীয় অঞ্চলের মানুষের ফুসফুসের কর্মক্ষমতা ইউরোপীয়দের থেকে প্রায় ২০ ভাগ কম, যার জন্য এ অঞ্চলের মাত্রাতিরিক্ত বায়ু দূষণকে অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। শঙ্কার বিষয় এই যে, বায়ুদূষণের ক্ষতিকর প্রভাব শুধু মানব স্বাস্থ্যের ওপরই সীমাবদ্ধ নয়; জীবজগত ও উদ্ভিদের ওপরেও এর প্রভাব মারাত্মক। উপরন্তু, জলবায়ু পরিবর্তনে বায়ুদূষণ গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখছে, বিশেষ করে কালো-কার্বন ও ওজন জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখায় এদেরকে ‘শর্ট লিভট ক্লাইমেট প্লুট্যান্টস’ বলা হয়ে থাকে। বায়ুদূষণের এমন সব বহুমাত্রিক ক্ষতিকর প্রভাব থাকা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত এটি নিয়ন্ত্রণে কোনো আন্তর্জাতিক ট্রিটি বা সমঝোতা নেই। শুধু ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশসমূহ নিজেরা একটি আঞ্চলিক চুক্তিতে আবদ্ধ যেখানে প্রতিটি দেশের জন্য নিঃসরণ সীমা নির্ধারিত রয়েছে যা অতিক্রম করলে দেশগুলোকে জরিমানা গুনতে হয়। এমন বাস্তবতায়, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে বিশ্বব্যাপী জন-রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিকভাবে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। সে নিরিখে, নির্মল বায়ুর জন্য উৎসর্গীকৃত আন্তর্জাতিক দিবসটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ। তাছাড়া, এই সময়ে কোভিড-১৯ করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে সারা বিশ্বব্যাপী চলমান অনাকাঙ্ক্ষিত মহামারী মোকাবেলায় দেশে দেশে লকডাউন পালনের ফলে বায়ুমানের যে উন্নতি পরিলক্ষিত হয়েছে তা নিয়ে বিস্তর গবেষণা ও আলোচনার মাধ্যমে দিনটিকে অর্থবহ করে তোলা যায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তৎকালীন ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থা থেকে দ্রুত উত্তরণের তাড়নায় ইউরোপ ও আমেরিকায় যত্রতত্র শিল্পকারখানা স্থাপন ও সেসব কারখানায় কয়লা পোড়ানো শুরু হয়। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্রমবিকাশ ও প্রতিযোগিতায় সেসব দেশের অনেক শহর অধিকতর ব্যস্ত হয়ে ওঠে। এরই মাঝে ১৯৪৮ সালের ৬ জানুযারি আমেরিকার লস-অ্যাঞ্জেলস শহরের আকাশ ধোঁয়ার মতো আস্তরণে ঢেকে যায়, ফলে অনেক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে। তার কিছুকাল পর ১৯৫২ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রায় পাঁচদিনের জন্য লন্ডন শহর ও এর আশেপাশের এলাকা ধোঁয়ায় আচ্ছাদিত হয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়, যার প্রভাবে প্রায় ৪০০০ মানুষ মৃত্যবরণ করে। এ দুটি ঘটনা ইতিহাসে যথাক্রমে ‘লস-অ্যাঞ্জেলস ফটোকেমিক্যাল স্মগ’ ও ‘লন্ডন সালফার স্মগ’ নামে পরিচিত। এ দুটি ঘটনাই প্রকৃতপক্ষে মানুষকে প্রথম বায়ুদূষণের ভয়াবহতা সম্পর্কে অবহিত করে এবং মানুষ জানতে পারে, বায়ুদূষণ মানুষের মৃত্যু ঘটাতে সক্ষম। সেই থেকে আজ অবধি এই ৭০ বছরে বিশ্বে জনসংখ্যা বেড়েছে, শহরায়ন বেড়েছে, শিল্পের বিস্তার ঘটেছে বহুগুণ ও বহুমাত্রিক এবং জ্বালানীর ব্যবহার বেড়েছে অনেকগুণ। এ অবস্থায়, পৃথিবীর অধিকাংশ বসত এলাকাই এখন বায়ুদূষণের কবলে পতিত। সমীক্ষায় প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, পৃথিবীর জনগোষ্ঠীর ৯০%-ই এখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক সংজ্ঞায়িত অনিরাপদ বায়ুতে বসবাস করে। কোনো কোনো অঞ্চলের, বিশেষ করে আমাদের এশিয়া মহাদেশের বায়ুদূষণের চিত্র আরো ভয়ংকর; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক পৃথিবীর প্রায় ১৬০০টি শহরের বায়ুমান মাত্রা পর্যালোচনা করে যে তালিকা তৈরি করা হয়েছে তার প্রথম ২০টি অধিক দূষিত শহরের সবগুলোই আমাদের দক্ষিণ এশিয়ার। যদিও বাংলাদেশের শুধু নারায়ণগঞ্জ উক্ত ২০টি শহরের অন্তর্ভুক্ত, তদুপরি স্বস্তির কিছু নেই – পরিবেশ অধিদপ্তরের বায়ুমান মনিটরিং তথ্যমতে ঢাকা ও গাজীপুরের বায়ুর মান নারায়ণগঞ্জ শহরের বায়ুর মানের বেশ কাছাকাছি এবং দেশের অন্যান্য শহর (চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেট, ইত্যাদি)-এর বাতাসের মানও যথেষ্ট খারাপ। এমতাবস্থায়, রাষ্ট্রীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভাবে আইন, চুক্তি/সমঝোতার মাধ্যমে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের উদ্যেগ গ্রহণ করার বিকল্প নেই। উল্লেখ্য, বায়ুদূষকসমূহ বিশেষ করে ক্ষুদ্র বস্তুকণা হাজার মাইল পথ বাতাসে ভেসে অন্য দেশ/অঞ্চলকে দূষিত করতে পারে। কিছুদিন পূর্বে সাহারা মরুঝড়ের প্রভাবে সুদুর আমেরিকার উপকূল ধুলায় আছন্ন হয়। সাহারার ধুলা অবশ্য ইউরোপীয় শহরগুলোকে বেশি দূষিত করে। ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রায় ‘পীট ল্যান্ড ফরেস্ট’-এ আগুন লাগার ফলে প্রতিবছর জুলাই-অক্টোবর সময়কালে মালাক্কা প্রণালীর ওপারের মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরকে চরমভাবে দূষিত করে। বিভিন্ন গবেষণাপত্র থেকে জানা যায়, শুষ্ক মৌসুমে ইন্ডিয়ার উত্তর ও উত্তর-পূর্ব এবং নেপালের উৎসগুলো থেকে নিঃর্গত দূষকসমূহ আমাদের দেশের বিভিন্ন এলাকার বাতাসকে দূষিত করে থাকতে পারে।

২০০১ সালে পরিবেশ অধিদপ্তরের আওতায় সংসদ ভবন চত্বরে একটি সার্বক্ষণিক বায়ুমান মনিটরিং কেন্দ্র (ক্যামস) স্থাপনের মধ্য দিয়ে দেশে প্রকৃতপক্ষে বায়ুমান ব্যবস্থাপনার প্রক্রিয়া শুরু হয়। বর্তমানে অধিদপ্তরের আওতায় ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় ৩১টি ক্যামস বিদ্যমান। যদিও দেশের সকল বিভাগীয় শহর এখন বায়ুমান মনিটরিংয়ের আওতায় রয়েছে তবুও একটি সার্বজনীন বায়ুমান ব্যবস্থাপনার জন্য এই নেটওয়ার্ক জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বিস্তৃত করা প্রয়োজন। আন্তঃসীমানা পর্যায়ের দূষণ সঠিকভাবে নির্ণয়ের জন্য সীমান্তেও বায়ু মনিটরিং যন্ত্রপাতি স্থাপন করা দরকার। এ কাজে ক্যামস-এর পাশাপাশি ব্যয় সাশ্রয়ী সেন্সরভিত্তিক বায়ু মনিটরিং যন্ত্র স্থাপন করা যেতে পারে। তবে শুধু ক্যামস আর যন্ত্র স্থাপন করলেই হবে না, উৎপাদিত ডাটার মান অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে; তার সাথে ডাটা ব্যবস্থাপনা, বিশ্লেষণ ও ডাটার ব্যাখ্যা প্রদানে পারদর্শীতা অর্জন করতে হবে তবেই মনিটরিং থেকে বায়ুমান ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এর পাশাপাশি, সারা দেশে বিদ্যমান ছোট বড় সকল ধরনের উৎসকে জিআইএস ভিত্তিক ইনভেন্ট্রির আওতায় আনতে হবে – বায়ুমান ব্যবস্থাপনায় বিজ্ঞানভিত্তিক সমাধানের জন্য এটা অত্যাবশ্যক। পরিবেশ অধিদপ্তর এখন পর্যন্ত শুধু ইট-ভাটা ও স্টিল মিলের ইনভেন্ট্রি সম্পন্ন করেছে। বায়ুমান মনিটরিং থেকে গুনগত ডাটা উৎপাদন ও দেশব্যাপী ইমিশন ইনভেন্ট্রি করা সম্ভব হলে অফিসে থেকেই বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন সিজনে বায়ুমান ব্যবস্থাপনার নীতি নির্ধারণী করা সম্ভব – এবং তা হবে যথার্থ ও ব্যয় সাশ্রয়ী। এর জন্য বাংলাদেশ সরকার যে খসড়া ‘ক্লিন এয়ার অ্যাক্ট’ প্রণয়ন করেছে তা দ্রুততার সাথে চূড়ান্ত করে আইন আকারে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

ষড়ঋতুর বাংলাদেশে বায়ুমান চরিত্র বেশ জটিল; ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে বায়ুমান চরিত্রও পরিবর্তীত হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে ঢাকা শহরে ২৬ মার্চ থেকে ‘বন্ধ’ ঘোষণা করা হলে প্রায় ৭০% যানবাহন, সকল প্রকার কনস্ট্রাকশন ও আশেপাশের শিল্প কারখানার বড় অংশ বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু, বায়ুদূষণের এত সব উৎস বন্ধ করা হলেও ঢাকায় বায়ুমানের উন্নতি ১০% এর বেশি হয়নি, যা সত্যিই বিস্ময়কর। সুতরাং, সঠিক তথ্য ও বিজ্ঞান ভিত্তিক ব্যবস্থাপনাই বায়ুমান নিয়ন্ত্রণে একটি কার্যকর উপায় প্রদান করতে সক্ষম।

সম্পর্কিত পোস্ট

Green Page | Only One Environment News Portal in Bangladesh
Bangladeshi News, International News, Environmental News, Bangla News, Latest News, Special News, Sports News, All Bangladesh Local News and Every Situation of the world are available in this Bangla News Website.

এই ওয়েবসাইটটি আপনার অভিজ্ঞতা উন্নত করতে কুকি ব্যবহার করে। আমরা ধরে নিচ্ছি যে আপনি এটির সাথে ঠিক আছেন, তবে আপনি ইচ্ছা করলেই স্কিপ করতে পারেন। গ্রহন বিস্তারিত