26 C
ঢাকা, বাংলাদেশ
বিকাল ৩:০১ | ২৬শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
গ্রীন পেইজ
জলবায়ু পরিবর্তনে বদলাবে খাদ্যাভ্যাস, পরিশোধিত নোনা পানিতে সমুদ্র-শৈবাল উৎপাদন 
জলবায়ু

জলবায়ু পরিবর্তনে বদলাবে খাদ্যাভ্যাস, পরিশোধিত নোনা পানিতে সমুদ্র-শৈবাল উৎপাদন 

গরুর মাংস তৈরি হবে বিজ্ঞানাগারে, প্রয়োজন পড়বে না গরু কিংবা কসাইয়ের দোকান। পান্তা খামির থেকে তৈরি হবে হ্যামবার্গার এবং এতে থাকবে না এক ছটাকও মাংস। উড়ন্ত শূককীট থেকে তৈরি হবে টুনা মাছের মতো উচ্চ ক্যালসিয়াম সম্পন্ন খাবার। মুদি দোকানের পাশে কন্টেইনারে উৎপাদিত হবে সবজি। ছোলা থেকে তৈরি হবে দুধ। কেক তৈরির সব উপাদান পাওয়া যাবে একেবারে রেডিমেড ক্যাপসুলের ভেতর। ওভেনের ভেতর গরম করলেই তা একেবারে পরিপূর্ণ কেক হয়ে যাবে।

মনে হতে পারে এটি কোনও বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীতে দেখানো দূর ভবিষ্যতের কোনও দৃশ্য। কিন্তু না, খাবারের জগতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন শুরু হয়েই গেছে। বাজারে আসছে নতুন নতুন উদ্ভাবন, ফুড টেক এখন গতি অর্জন করছে এবং মানুষ একটি বিষয়ে অনেক বেশি একমত হতে শুরু করেছে। আর তা হলো: জলবায়ু সংকটের কারণে মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও তা উৎপাদনের প্রক্রিয়ায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সংকট তৈরি হচ্ছে জ্বালানি উৎপাদন, পরিবহন, শিল্পোৎপাদন ও নির্মাণের কারণে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এনভায়রনমেন্টাল প্রটেকশন এজেন্সির মতো, এই সংকটের জন্য অন্য যেকোনও ফ্যাক্টরের চেয়ে বড় প্রভাব রাখছে খাবার উৎপাদন ও পরিবহন।

গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমনে বড় একটি অংশ আসে খাদ্যের জন্য পশুপালন থেকে, এ নিয়ে তেমন কোনও দ্বিমত নেই। ১০০ গ্রাম মাংস প্রোটিন উৎপাদনের জন্য ১০০ গ্রাম টফু উৎপাদনের চেয়ে ৩০ গুণ বেশি গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গত হয়। এছাড়া, বিশ্বের ৭০ শতাংশের বেশি কৃষিজমি পশুখাদ্য উৎপাদনের জন্য বরাদ্দ। ফলে জলবায়ু সংকটের জন্য কৃষি বড় একটি কারণ এবং এই সংকটের সমাধানও হতে পারে কৃষিই।

আর এই সমাধান দ্রুত নিয়ে আসার জন্য ফুড টেক খাতে জড়িতরা কাজ করে যাচ্ছেন। এই শতাব্দীর মাঝামাঝিতে বিশ্বে আরও দুই থেকে তিনশ’ কোটি মানুষের খাবার প্রয়োজন হবে। এখন এই সংখ্যা ৭.৭ মিলিয়ন। চীন ও ভারতের দ্রুত প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের কারণে মাংসের চাহিদা আরও বাড়ছে। এই অগ্রগতির ফলে যে সংকট তৈরি হচ্ছে তা একেবারে স্পষ্ট: কীভাবে আরও বেশি মানুষকে খাবার দেওয়া সম্ভব হবে গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন কমিয়ে, যখন জলবায়ু পরিবর্তন খারাপের দিকে যাচ্ছে। সহজ করে বললে এই সংকটের সমাধানের উপায় হলো, কীভাবে কম জমিতে বেশি খাবার উৎপাদন করা যাবে কম জ্বালানি ও পানি ব্যবহার করে।
ইতোমধ্যে এই খাতে বিভিন্ন লক্ষ্যে অগ্রগতি হয়েছে। এতে বায়োপেস্টিসাইডস ও জিনগতভাবে পরিবর্তিত শস্য থেকে শুরু ব্যক্তিগত পুষ্টির চাহিদা মেটানোর কৃষি অন্তর্ভুক্ত। এসব পরিবর্তনের বেশ কিছু অর্থনীতি ও সামাজিক চাহিদা থেকে হলেও অনেকগুলোই স্বাস্থ্যজনিত উদ্যোগ।

প্রোটিনের উৎস সাগর

ইসরায়েলের সিয়াকুয়া খামারে কন্টেইনারে পরিশোধিত নোনা পানিতে সমুদ্র-শৈবাল উৎপাদন করা হচ্ছে। প্রথম দেখায় হবে এটি একেবারেই সমুদ্র শৈবাল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, টানা ১৫ বছরের গবেষণার পর এই প্রজাতি উদ্ভাবন করা হয়েছে। এতে মুরগির বুকের মাংসের চেয়ে ৩০ গুণ বেশি প্রোটিন রয়েছে।

বিশ্বের সমুদ্র শৈবালের বাজার প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের। বেশিরভাগ উৎপাদিত হয় পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন খামারে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষের খাবারে এটি যুক্ত করা হয়। তবে মূলত এটি পশুর খাবার।

ইসরায়েলি কোম্পানির এই সবুজ সমুদ্র শৈবালের নাম উলভা। যা ‘সি লেটুস’ হিসেবে বেশি পরিচিত।

খামারটির এক কর্মকর্তার মতে, লাখো মানুষের পুষ্টির চাহিদা মেটাতে পারে সি লেটুস। এতে প্রচুর পরিমাণে ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, আয়রন, পটাসিয়াম, ভিটামিন এ ও কে রয়েছে। এশিয়া-বহির্ভূত ভোক্তারা হয়তো দ্রুতই সি লেটুস কিনতে আগ্রহী হবে না। কিন্তু পুষ্টিমানের পাশাপাশি এর পরিবেশগত সুবিধাও রয়েছে।

খাদ্য তালিকায় পোকামাকড়

প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় সি লেটুসকে মেনে নেওয়া খুব কঠিন নয়। কিন্তু পোকামাকড় বা উড়ে বেড়ানো কীটপতঙ্গকে খাদ্য হিসেবে মেনে নেওয়া সহজ নয়। অনেক বছর ধরেই বলা হচ্ছে, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও অর্থনৈতিক কারণে ভবিষ্যতে আমরা যে প্রোটিন গ্রহণ করব সেগুলোর কিছুটা আসবে পোকামাকড় থেকে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, ভোজ্য পোকামাকড়ে প্রচুর পরিমাণ প্রোটিন, ভিটামিন, অ্যামিনো এসিড, ফ্যাটি এসিড ও ফলিক এসিড থাকে। ঝিঁঝিঁ পোকা, ফড়িং ও গুবরে পোকায় অনেক বেশি ক্যালসিয়াম, জিংক ও ম্যাগনেসিয়াম থাকে লাল মাংসের চেয়ে বেশি।

পোকামাকড় থেকে পুষ্টি গ্রহণের পরিবেশগত সুবিধাও অনেক। কীট-পতঙ্গ চাষের জন্য খুব বেশি জায়গার প্রয়োজন হয় না এবং দ্রুতই বংশবৃদ্ধি ঘটে। গরু ও ছাগলের চাইলে পালনও সহজ। এছাড়া এগুলো গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গত করে না। পোকামাকড় আফ্রিকা ও পূর্ব এশিয়ার খাওয়া হয়। কিন্তু পশ্চিমে এগুলোকে খাদ্য তালিকায় যুক্ত করার ক্ষেত্রে মানসিক বাধা রয়েছে।

ফ্লাইং স্পার্ক নামের একটি ইসরায়েলি কোম্পানি পোক-মাকড় ও কীট-পতঙ্গ থেকে প্রোটিন তৈরির জন্য কাজ করে যাচ্ছে। কোম্পানির বিজ্ঞানাগারে কয়েক লাখ মাছি পালন করা হচ্ছে। কোম্পানিটির প্রতিষ্ঠাতা ও কর্ণধার এরান গ্রোনিখ মনে করেন, প্রোটিন উৎপাদনের এটিই সবচেয়ে কার্যকর পন্থা।

সুপারফুড সবুজ শেওলা

পোকামাকড় ও সামুদ্রিক শৈবাল নিয়ে বড় ধরনের প্রত্যাশা থাকলেও অনেকেই সুপারফুড হিসেবে সবুজ শেওলাকে প্রোটিনের উৎস হিসেবে বিবেচনা করতে চান। এতে রয়েছে ৪৫ শতাংশ পরিপূর্ণ প্রোটিন। যার অর্থ হলো প্রতিদিন একজনের যে অ্যামিনো এসিড প্রয়োজন হয় তা পুরোমাত্রায় রয়েছে। এছাড়া রয়েছে আয়রন, ওমেগা ৩ ও বি-১২ ভিটামিন। যা শুধু প্রাণির মধ্যে পাওয়া যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, সবুজ শেওলার আয়রন ও প্রোটিন খুব কার্যকরভাবে শরীর গ্রহণ করে এবং তা চিনির ভারসাম্য বজায় রাখে নাটকীয়ভাবে। সংক্ষেপে, এটি হতে পারে মাংসের সুলভ বিকল্প।

এটি পুকুরে জন্মায় অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে। প্রতি ৭২ ঘণ্টায় পরিমাণ দ্বিগুণ হয়। এর কোনও গন্ধ বা স্বাদ নেই এবং সম্পূরক খাদ্য হিসেবে বাজারজাত করা হয়ে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সবুজ শেওলা বিক্রি করে ইসরায়েলি কোম্পানি হিনোম্যান।

১ চামচে ৫০ কেজি চিনির মিষ্টি

পরিবেশ বা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর খাদ্য উৎপাদনের বিকল্পের উদাহরণ সবুজ শেওলা। কিন্তু উদ্ভিদে পাওয়া প্রোটিনকে ভিত্তি ধরে একটি মিষ্টিকারক উৎপাদন করেছে আমায় প্রোটিন নামের কোম্পানি। চিনির মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই এটির এবং ১০ হাজারগুণ বেশি মিষ্টি। অন্যভাবে বললে, এটি মাত্র ১ চা-চামচ পরিমাণ যে মিষ্টি পাওয়া যায় সেজন্য ৫০ কেজি চিনি প্রয়োজন হবে।

এক বাক্সে পুরো রান্নাঘর

ভবিষ্যতের ফুড-টেক সাম্রাজ্য দখল করে নিতে অনেকটাই এগিয়ে আছে ইসরায়েলি বিভিন্ন কোম্পানি। তাদের আরেকটি অভিনব উদ্ভাবন হলো ‘জিনি’। যেটিকে কোম্পানিটি ‘এক বাক্সে একটি রান্নাঘর’ বলে বাজারজাত করছে। এতে প্রচলিত রান্না ও বেকিংয়ের বিকল্প পদ্ধতি রয়েছে। তথাকথিত এই স্মার্ট ওভেন উদ্ভাবন করেছেন দুই ইসরায়েলি। মাত্র তিন থেকে চার মিনিটে হিমায়িত-শুষ্ক উপাদান থেকে খাওয়ার উপযুক্ত খাবার তৈরি করে এই যন্ত্র। মিশ্রিত পণ্যের প্যাকেটে একটি বার কোড থাকে, যা স্ক্যান করে সেই নির্দেশনা অনুসারে খাবার প্রস্তুত করে ‘জিনি’। কোম্পানিটি এখন পর্যন্ত ১৭টি বিভিন্ন ধরনের খাবার বাজারজাত করছে যেগুলোতে কোনও রাসায়নিক পদার্থ, প্রিজারভেটিভ, স্ট্যাভিলাইজার ও রঙ নেই। তাদের বাজারজাত করা খাবারের মধ্যে রয়েছে চাল, পাস্তা ও আপেল মাফিন।

মাংস ছাড়া বার্গার

প্রোটিন উৎসের বিকল্প ও অপ্রচলিত ওভেনের কথা উৎসাহব্যঞ্জক হলেও সবচেয়ে জরুরি হলো মাংসের বিকল্প হাজির করা। শুধু পুষ্টির কারণে নয়, স্বাদ ও গন্ধের দিক থেকেও। কারণ যে কোনও মানবিক কর্মকাণ্ডের চেয়ে বেশি জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে পশুপালন। এমন নয় যে, মানুষের প্রতিযোগিতার কারণে গরুর মাংসের পরিবর্তে মানুষ সামুদ্রিক শেওলা বা পোকামাকড়ে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে।

গরুর মাংসের বিকল্প তৈরির জন্য কাজ করছে ইম্পসিবল ফুডস ও বিওন্ড মিট। উভয় কোম্পানির সদর দফতর যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায়। তারা মাংসের স্বাদ ও গন্ধের সমন্বয়ে একটি হ্যামবার্গার তৈরি করছে পান্তা খামির থেকে। এক পরীক্ষায় অংশ নেওয়া অর্ধেকেই ইম্পসিবল বার্গার ও বিফ বার্গারের কোনও পার্থক্য ধরতে পারেননি। তিন মাস আগে কোম্পানিটি বিক্রির অনুমোদন পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ৭ হাজার শাখায় এই বার্গার বিক্রি হচ্ছে। বিওন্ড মিটের বার্গারও ৯ হাজার ডানকিন ডোনাট দোকানে পাওয়া যাচ্ছে। পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে ম্যাকডোনাল্ডসের ২৮টি শাখাতেও বিক্রি শুরু হয়েছে।

বিজ্ঞানাগারে গরুর মাংস

গরুর মাংসের স্বাদ ও গন্ধ নয়, আলেফ ফার্মস নামের একটি কোম্পানি বিজ্ঞানাগারে গরুর মাংস উৎপাদনের চেষ্টা করছে। ২০১৩ সালে একটি ডাচ কোম্পানির এমন একটি উদ্যোগ সফল হয়েছিল। তবে ১৪০ গ্রাম ওজনের একটি বার্গার তৈরির খরচ ছিল আকাশছোঁয়া, ৩ লাখ ডলার। তবে এখন আলেফ ফার্মস গত ডিসেম্বরে গরুর মাংসের একটি ‘স্টেক’ তৈরি করেছে, যেটি উৎপাদনে মাত্র ৫০ ডলার ব্যয় হয়েছে। কোম্পানিটি এখন স্বাদ ও গন্ধের উন্নয়নে কাজ করছে। সূত্র: হারেৎজ।

“Green Page” কে সহযোগিতার আহ্বান

সম্পর্কিত পোস্ট

Green Page | Only One Environment News Portal in Bangladesh
Bangladeshi News, International News, Environmental News, Bangla News, Latest News, Special News, Sports News, All Bangladesh Local News and Every Situation of the world are available in this Bangla News Website.

এই ওয়েবসাইটটি আপনার অভিজ্ঞতা উন্নত করতে কুকি ব্যবহার করে। আমরা ধরে নিচ্ছি যে আপনি এটির সাথে ঠিক আছেন, তবে আপনি ইচ্ছা করলেই স্কিপ করতে পারেন। গ্রহন বিস্তারিত