27 C
ঢাকা, বাংলাদেশ
ভোর ৫:৫৩ | ২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ১১ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
গ্রীন পেইজ
কীটনাশক (Pesticides) এর ইতিবৃত্ত
আন্তর্জাতিক পরিবেশ রহমান মাহফুজ

কীটনাশক (Pesticides) এর ইতিবৃত্ত

কীটনাশক (Pesticides) এর ইতিবৃত্ত

রহমান মাহফুজ, প্রকৌশলী, পরিবেশ কর্মী, পরিবেশ এবং পরিবেশ অর্থনৈতিক কলামিষ্ট, সংগঠক এবং সমাজসেবী।

কীট বলতে বৃহত্তর অর্থে বুঝায় – উদ্ভিদ, প্রাণী বা ক্ষুদ্রতম প্রাণী জাতীয় যে সকল জীব মানুষের জন্য ক্ষতিকর বা মানুষ চায়না এমন স্থানে বসবাস করে।

আর কীটনাশক হ’ল এমন বস্তু বা কয়েকটি বস্তুর মিশ্রণ যা পোঁকামাকড়, মশা-মাছি জাতীয় পরজীবি ক্ষুদ্র পোঁকা, কেঁচো, কৃমি জাতীয় পোঁকা, আগাছা, ইদুর ইত্যাদি কীট প্রতিরোধে, দমনে, তাড়ানোতে অথবা প্রশমনের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়।

যেমন, পোঁকা দমনে রয়েছে পোঁকা দমন ঔষধ – ইনসেক্টিসাইড (insecticide), আগাছা জাতীয় উদ্ভিদ দমনে রয়েছে আগাছা দমন ঔষধ – হার্বিসাইড (herbicide), প্যাঙ্গাস জাতীয় কীট দমনে রয়েছে –ফাঙ্গিসাইড (fungicide) ইত্যাদি। বর্তমানে পৃথিবীতে ১০,০০০ এরও বেশী কীট দমনের ঔষধ রয়েছে।

কীটনাশকের ইতিহাস (History of pesticide):

কীটনাশকের ইতিহাস ৩ পর্যায়ে বিভক্ত:

(১) প্রথম পর্যায় (১৮৭০ সালের পূর্ব পর্যন্ত): প্রাকৃতিক কীটনাশক, যেমন প্রাচীন গ্রীসে কীট দমনে সালফার ব্যবহার করা হতো।

(২) দ্বিতীয় পর্যায় (১৮৭০ – ১৯৪৫): কৃত্রিম অযৌগ কীটনাশকের যুগ, প্রাকৃতিক বস্তু এবং অযৌগ পদার্থ মিশ্রিত করে কীট নাশক তৈয়ার করা হতো।

(৩) তৃতীয় পর্যায় (১৯৪৫ এর পর হতে): কৃত্রিম যৌগ কীটনাশকের শুরু।

১৯৪৫ এর পর হতে মানুষের তৈরী কীটনাশক যেমন ডিডিটি (DDT), দুই, চার-ডি (2,4-D) এবং পরে এইচসিএইচ (HCH) অযৌগ। প্রাকৃতিক কীটনাশকের মধ্যে যেহেতু বেশীর ভাগ কীটনাশকই মানুষের দ্বারা তৈয়ারী কৃত্রিম বস্তু এ জন্য এ গুলোকে রাসায়নিক কীটনাশকও বলা হয়।

রাসায়নিক কীটনাশককের ব্যবহার কৃষি সুরক্ষা ও কৃষি উৎপাদনে বিশাল অগ্রগতি অর্জণে মানব সভ্যতার নতুন দরজা খুলে দেয়। কিন্তু ইহা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ বির্পযয়েরও একটি বড় কারণ হয়ে দাড়িয়েছে।

কীটনাশকের শ্রেণীবিভাগ (Classification of pesticides)

১। লক্ষ্যভেদে:

  • পোঁকা দমনে পোঁকা দমন ঔষধ – ইনসেক্টিসাইড (insecticide),
  • আগাছা জাতীয় উদ্ভিদ দমনে আগাছা দমন ঔষধ – হার্বিসাইড (herbicide),
  • ফ্যাঙ্গাস জাতীয় কীট দমনে– ফাঙ্গিসাইড (fungicide),
  • ইঁদুর দমনে – রোডেনটিসাইড (rodenticides),
  • অ্যালজি দমনে – অ্যাজিসাইড (algaecides),
  • কৃমি জাতীয় পোঁকা দমনে – নেমাটিসাইড (nematicides),
  • পাখির সংখ্যা হ্রাসে ব্যবহার করা হয় – এভিসাইডস (Avicides),
  • মেরুদন্ডহীন এবং দেহে ফাঙ্গাস জাতীয় চর্মরোগ সৃষ্টিকারী পোঁকা দমনে – ফামিগেন্টস (Fumigants),
  • উদ্ভিদের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রনকারী – (Plant Growth Regulators),
  • কীট পতঙ্গের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রনের জন্য – (Insect Growth Regulators,
  • মাইক্রোবাল কীটনাশক, বায়োকেমিক্যাল কীটনাশক, উদ্ভিদ সরক্ষকসহ প্রাকৃতিকভাবে উৎপন্ন কীটনাশকের নিয়ন্ত্রনের – বায়োকীটনাশক (Biopesticides)
  • অযাচিত বা আণ্যমাচকে আক্রমনকারী মাছ দমনে – পিসিসাইড (Piscicides), এবং
  • বুকের উপর ভর করা প্রাণিী (slugs), শামুক (snails), ঝিনুক (bivalves) জাতীয় প্রাণী দমনে – মুলোসসাইড (Molluscides) ইত্যাদি।

২। রাসায়নিক ভেদে: যৌগ এবং অযৌগ

ক) যৌগ (Organic):

১। প্রাকৃতিক যৌগিক: পোঁকা- মাকড়ের ঔষধগুলো (Insecticides) দুই প্রকার:-

  • (ক) খনিজ: যেমন কেরোসিন তেল।
  • (খ) জৈব কীটনাশক (Biopesticide): যেমন নীম পাতা বা গাছ দ্বারা তৈরী কীটনাশক (Neembisidin)।

২। কৃত্রিম যৌগিক: পোঁকা- মাকড়ের ঔষধগুলো (Insecticides): –

  • (ক) অর্গানো ক্লোরিন; যেমন, ডিডিটি (DDT), এলড্রিন (Aldrin।)
  • (খ) অর্গানো ফসফরাস; যেমন, মালথিয়ন (Malthion) সুমিথিয় (Sumithion), নোগস (Nogos),
    মেটাসিসটক্স (Metasystox), ডিমক্রণ (Dimecron)।
  • (গ) অর্গানো কার্বোনেট; যেমন, ফুরাদান (furadan), সেভিন (Sevin) ।
  • (ঘ) কৃত্রিম পাইরিথ্রোড; যেমন, রিপকর্ড (Ripcord), সিমবুস (Seembush) ।
খ) অযৌগিক (Inorganic) :

সালফেট (sulphates), আর্সেনেটস (arsenate’s,), ক্লোরাইড অব লিড (chlorides of lead), কপার (copper) ইত্যাদি।

৩। বাস্তব অবস্থাভেদে: ডাস্ট (Dusts), দ্রবীভূত দ্রব (dissolved solution), ভাসমান দ্রব (suspended solution), উদ্বায়ী বস্তু (volatile solids) ।

৪। কার্যকারিতা ভেদে: শরীরের সংষ্পর্শের বিষ (contact poisons), ফেনা সৃষ্টিকারী (fumigants), পাকস্থলীর বিষ (stomach poisons), প্রদ্ধতিগত বিষ (systemic poisons)

গ) ইনসেক্টিসাইডস (Insecticides):

ইনসেক্টিসাইডস হলো বিভিন্ন বস্তুর সমন্বয়ে গঠিত এমন একটি যৌগিক যা কীট পতঙ্গের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কার্যকর। বিভিন্ন প্রজাতীর কীট পতঙ্গের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ধরনের ইনসেক্টিসাইডস এর প্রচলন রয়েছে।

বেশীরভাগ ইনসেক্টিসাইডস স্প্রে এর সাহায্যে প্রয়োগ করা হয়; অন্য প্রদ্ধতিগুলোর মধ্যে রয়েছে পাউডার, এরোসোল, ফেনা, টোপ হিসাবে ব্যহৃত হয়। বর্তমানে বেশীরভাগ ইনসেক্টিসাইডসই কৃত্রিম রাসায়নিক যৌগিক এবং স্নায়ুবিক বিষ।

এই ইনসেক্টিসাইডসগুলো কীট পতঙ্গ নিশ্বাসের সাহায্যে গৃহীত স্বায়ুতন্তকে আক্রান্ত করে। যদিও বিভিন্ন প্রকার কৃত্রিম যৌগিক ইনসেক্টিসাইডস রয়েছে, তবে প্রধান ৩ টি গ্রুপ হলো

  • (১) ক্লোরিনেটেড হাইড্রোকার্বণ (chlorinated hydrocarbons),
  • (২) অর্গানো ফসফরাস মিশ্রণ বা অর্গানো ফসফেট (organophosphorus compounds or organophosphates) এবং
  • (৩) কার্বোনেট (Carbamates)।
১) ক্লোরিনেটেড হাইড্রোকার্বণ (chlorinated hydrocarbons):

ইহাকে অর্গানো ক্লোরিনও বলা হয় এবং বানিজ্যিকভাবে প্রথম ব্যবহার হয়।

অর্গানিক ইনসেক্টিসাইডস গুলোর উদাহরণ – ডিডিটি (DDT), এলড্রিন (Aldrin), ক্লোরডেন (chlordane), ডাইলড্রেন (dieldrin), এনড্রিণ (endrin), লিনডিন (lindane) এবং হেপটাক্লোর (heptachlor)।

২) অর্গানো ফসফরাস যৌগসমূহ (Organophosphorus Compounds):

অর্গানো ফসফরাস যৌগসমূহ ইনসেক্টিসাইডসসমূহের মধ্যে সবচেয়ে বিষাক্ত। এগুলো শুধু কীটপতঙ্গের জন্য বিষাক্ত নয়, মানুষের জন্যও বিষাক্ত ও ক্ষতিকারক। এগুলোর মধ্যে অনেকগুলো যেমন, প্যারাথিয়ন, প্যারাক্সন, টাইমেট এবং টেটরাম মানুষের জন্য সকল বিষের মধ্যে অত্যন্ত মারাত্বক।

মাত্র ২ মিলি প্যারা থিয়ন একটি শিশুর মৃত্যু ঘটাতে সক্ষম। মানুষের মধ্যে এই বিষের লক্ষণগুলো হ’ল বুমি করা, ডায়রিয়া, পিচ্ছিল ঘাম বের হওয়া, মূখ দিয়ে লালা বের হওয়া, চোখে ঝাপসা দেখা এবং শরীর কাঁপা। তীব্র লক্ষণ হ’ল শ্বাষ-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া।

৩) কার্বামেটস (Carbamates):

প্যারাথিয়ন এবং ম্যালাথিয়ন এর মতো অর্গানোফসফেট কীটনাশক যেভাবে ফসফরিক অ্যাসিডের বিষাক্ততায় তৈরী, কার্বামেটসমূহ তেমনি কার্বামিক অ্যাসিডের বিষাক্ততায় তৈরী। শাকসবজির কীট দমনে কার্বামেট ব্যপকভাবে ব্যবহৃত হয়। আলিডিক্রাব (aldicarb) এবং কার্বোফুরান (carbofuran) কার্বামেটের উদাহরণ।



হার্বিসাইডস বা উইডিসাইড (Herbicides or Weedicides):

আগাছা জাতীয় উদ্ভিদ দমনে ব্যবহার করা হয়। ১৯৬৫- ১৯৭০ এর মধ্যে ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিণ সেনাবাহিনী ভিয়েতনামের কৃষি জমি ও বনাঞ্চলে প্রচুর পরিমান অমিশ্রিত ২,৪- ডি (2,4-Dichlorophenoxy acetic acid) এবং ২,৪,৫-টি (2,4,5 Trichloro phenoxy acetic acid) নিক্ষেপ করে/ব্যবহার করে মশা ও কীট-পতঙ্গ দমনের জন্য।

এর সাথে মার্কিণ সেনাবাহিনী কৃষি জমিতে, বনাঞ্চলে, পুকুর, জলাশয়ে আগাছা নিধনের জন্য প্রচুর পরিমান পিনোক্সি হার্বিসাইড (Phenoxy herbicides -PHs) ব্যবহার করে।

পিনোক্সি হার্বিসাইড (PHs) এর জৈব রাসায়নিক বিক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। ইহা ব্যবহারের পর রাসায়নিক জৈবসমূহ আগাছা তার পাতা ও কান্ডের ছিদ্র পথে (through stomata) গ্রহন করে এবং দ্বিতীয়ত গাছের মূল দ্বারা দেহে শোষিত হয়, যা আগাছার বৃদ্ধি রোধ করে এবং বিপাক ক্রিয়া বন্ধ করে দেয়, ফলে আগাছা ধ্বংস হয়ে যায়।

ক্লিনিক্যাল লক্ষণগুলো হল কৃষকগন মারাত্বক বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়। তার মধ্যে আছে শরীর ব্যথা করা এবং পাগুলো দূর্বল অনুভব করা ও মাংসপেশীর খিঁচুনী। সম্প্রতি 2, 4, -D এর নির্দিষ্ট নিউরোটক্সিন প্রভাবগুলি পরীক্ষা করা হয়েছে। ইহাতে দেখা যাচ্ছে যে , ইহার বিষক্রিয়ায় মস্তিষ্কের ম্যমোরী সেল বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

জনমত এবং যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সংরক্ষণ এজেন্সি (US Environmental Protection Agency -EPA) এর চাপে ১৯৭৯ সালে পিনোক্সি হার্বিসাইড নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু আলিসা ২ এর প্রতিবেদন (Alsea II report) এ উঠে এসেছে যে, এখনও ভূট্টা, গম এবং ধান উৎপাদনে পিনোক্সি হার্বিসাইড এর ব্যপক ব্যবহার রয়েছে।

বাৎসরিক বিশ্বে উৎপাদন: ১৯৫৪ সালে যেখানে কীটনাশকের উৎপাদন ছিল ৬০০০মিলিয়ন পাইন্ড, ১৯৭৩ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয়

কীটনাশকসমূহের ক্ষতিকারক ফলাফল (Bad effect of pesticides):

যখন আমরা কোন ফসলে, উদ্ভিদে এবং কোন কীটজাতীয় প্রাণীর উপর কীটনাশক ব্যবহার করে থাকি বেশীরভাগই উহাদের দ্বারা শোষিত হয়।

কিন্তু কিছু কীটনাশক বাষ্প আকারে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং বৃষ্টির পানির সাথে মিশে ভূ-পৃষ্ঠে পতিত হয়। অন্য একটি অংশ মাটিতে থেকে যায়। ইহা পানির স্রোতের সাথে পুকুর, জলাশয়, নদীর পানির সাথে মিশে যায়। কিছু অংশ ভু-গর্ভস্থ পানির সাথে মিশ্রিত হয়।

বৃষ্টি কীটনাশক অনেক দূরে নিয়ে যেতে পারে । একবার জাপানের একটি লেকের পানিতে কীটনাশক পাওয়া যায়। কিন্তু ঐ সময় জাপান কোন কীটনাশক ব্যবহার করেনি। তখন দেখা গেল ১৫০০ কিমি দূরে চীন ও কুরিয়া যে কীটনাশক ব্যবহার করেছিল তা বৃষ্টির পানির সাহায্যে ঐ লেক এর পানির সাথে মিশে দূষিত করেছে।

কুয়াশা বৃষ্টি অপেক্ষা ঘন, তাই কুয়াশা বৃষ্টি অপেক্ষা বেশী কীটনাশক ধরে রাখতে পারে। এ জন্য শীত প্রধান দেশে কীটনাশকের দূষণ মারাত্বক পরিবেশগত সমস্যা।

কীটনাশক ব্যবহারে উপকারিতা এবং ঝুঁকিসমূহ (Benefits and risks of pesticide application):

বিশ্বে আনুমানিক ৯০০০ প্রজাতির কীট ও অতিক্ষুদ্র পরিজীবি প্রাণী রয়েছে (insects and mites), ৫০,০০০ প্রজাতির মানুষের জন্য ক্ষতিকর অতিক্ষুদ্র উদ্ভিদ রয়েছে (plant pathogens) এবং ৮০০০ প্রজাতির শস্য, ফসল নষ্ট করে এমন আগাছা রয়েছে।

বিশ্বে কীট-পতঙ্গ ফসলের ১৪% নষ্ট করে, অতিক্ষুদ্র পরিজীবি প্রাণীরা করে ১৩% এবং আগাছায় নষ্ট করে ১৩%। বিশ্বে যত ফসল হয় তার এক-তৃতীয়াংশ উৎপন্ন হয় কীটনাশক ব্যবহারের ফলে।

কীটনাশক ব্যবহার করা না হলে ফল, সবজি এবং দানাদার খাদ্যের ক্ষতির পরিমান যথাক্রমে ৭৮%, ৫৪% এবং ৩২% দাড়াত। কীটনাশক ব্যবহার করা না হলে ফসলের ৩৫% -৪২% ক্ষতি হয়।

যেহেতু পৃথিবীতে ফসল জন্মানোর জমি কম এবং তাও আবার নগরায়ন ও যাতায়তের জন্য অবকাঠামো নির্র্মানের কারনে ক্রমাগতভাবে হ্রাস পাচ্ছে, অপর দিকে পৃথিবীর জনসংখ্যা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাছে, ফলে এত বিপুল জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তায় ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি ও ফসলের নিরাপত্তা প্রয়োজন।

বেশীরভাগ কীটনাশক স্বতঃস্ফুর্তভাবে মানুষ তৈরী করেনি। বেশীরভাগ কীটনাশকই মানুষ ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত উচ্চ ক্ষমতার বিষ বিশেষ। এই সকল কীটনাশক এবং ইহাদের অবশেষ বায়ুমন্ডল, মাটি এবং নদীতে মিশে যায়। এর ফলে এ সকল বিষাক্ত পদার্থ মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈয়ার করে এবং পরিবেশকেও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।

কীটনাশকের ধরুণ পরিবেশগত দূষণে এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং পূর্ব ইউরোপের জন্য এখন মারাত্বক সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে। বিশ্বে কীটনাশক উৎপাদন ও ব্যবহারে ৪ টি পেক্ষাপট রয়েছে।

  • (১) কিছু দেশ খুবই উচ্চ ক্ষমতার বিষাক্ত কীটনাশক উৎপাদন করছে ও ব্যবহার করছে।
  • (২) তুলা, সবজি এবং ধান উৎপাদনে অতিমাত্রায় কীটনাশক ব্যবহার হচ্ছে।
  • (৩) কিছু দেশ খারাপ মানের এবং পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্বকভাবে ক্ষতিকর ও বিষাক্ত কীটনাশক মনিটর ও নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, সে সবদেশে স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ঝুঁকি ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, এবং
  • (৪) কীটনাশকের অবশেষসমূহ সঠিকভাবে ও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় না।

বিশ্বে কীটনাশক দূষণের পরিস্থিতি (Worldwide Situation of Pesticide Pollution):

বিশ্বে প্রতিবছর ৪.৬ বিলিয়ন টন কীটনাশক পরিবেশে ছিটানো হয়। বর্তমানে বিশ্বে ৫০০ কীটনাশক বেশী পরিমানে ব্যবহৃত হচ্ছে, যা অর্গানোক্লোরোনেটেড কীটনাশক, এগুলোর মধ্যে কিছু রয়েছে যেগুলোতে পারদ (mercury), আর্সেনিক (arsenic), এবং সীসা (lead) এর মত পরিবেশের জন্য মারাত্বক ক্ষতিকর উচ্চ ক্ষমতার বিষাক্ত বস্তু রয়েছে।

ব্যবহৃত কীটনাশকের মধ্যে মাত্র ১% যে উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করা হয় তার জন্য কার্যকর হয়, বাকি ৯৯% ই উদ্দেশ্যবিহীন কাজে যেমন মাটিতে, পানিতে এবং বায়ুমন্ডলে ছড়িয়ে পড়ে যা বিশেষত বিভিন্ন প্রাণীদেহে প্রবেশ করে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ রক্ষা সংস্থা (US Environmental Protection Agency- EPA) তথ্যমতে গ্রামীন বেশীর ভাগ ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন কুপ/কলে ১২৭টি কীটনাশকের মধ্যে কমপক্ষে একটি রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক ইকোডরের পাহাড়সমূহের চূড়ায় জমাকৃত বরফের ৯০টি স্থানের নমুণা সংগ্রহ করে পরীক্ষায় ডিডিটি (DDT), এলড্রিণ (aldrin) এবং লিন্ডডেন (lindane) এর অবশেষ পেয়েছে।

গবেষকরা গ্রীণল্যান্ডের বরফ শীটে, এর্ন্টাটিকার পেইঙ্গুন পাখির দেহে ডিডিটির মত কীটনাশকের উচ্চ মাত্রার অবশেষ পেয়েছে, যা বায়ুর ঘূর্ণীবাত প্রবাহ, সমুদ্র স্রোত এবং জীবদেহে কীটনাশকের সমৃদ্ধির বিষয়টি নির্দেশ করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচীর তথ্যমতে প্রতিবছর বিশ্বে ২.৬০ কোটি লোক কীটনাশকের বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়, তর্মধ্যে ২.২০ লক্ষ লোক মারা যায়।

কুৎসিৎ ডজন (Dirty dozen):

১৯৯৫ সালের মে মাসে জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচীর গর্ভানিং কাউন্সিল ১২ টি অবিছিন্ন জৈব দূষক (persistent organic pollutants-POPs) উপর গবেষণার সিদ্ধান্ত নেয়।

গবেষণার প্রাথমিকভাবে অধিক ক্ষতিকারক বিবেচনায় যে ১২ টি ক্ষতিকারক জৈব দূষকের তালিকা করা হয়েছে, সেগুলোকে একত্রে কুৎসিৎ ডজন (Dirty dozen) বলা হয়। কুৎসিৎ ডজন (Dirty dozen)গুলোর নাম নিন্মে দেয়া হ’ল:

  • (১) এলড্রিণ (Aldrin)
  • (২) ক্লোরডেন (chlordane)
  • (৩) ডিডিটি (DDT)
  • (৪) ডাইলড্রিণ (Dieldrin)
  • (৫) এনড্রিণ (Endrin)
  • (৬) হেপ্টাক্লোর (Heptachlor)
  • (৭) হেক্সাক্লোরোবেনজিন (Hexachlorobenzene)
  • (৮) মিরেক্স (Mirex)
  • (৯) পলিক্লোরিনেটেড বাইফিনাইলস (polychlorinated biphenyls)
  • (১০) পলিক্লোরিনেটেড ডাইবেঞ্জো-পি-ডাইঅক্সিন (polychlorinated dibenzo-p-dioxins)
  • (১১) পলিক্লোরিনেটেড ডাইবেঞ্জোফুরানস (polychlorinated dibenzofurans), এবং
  • (১২) টক্সাপেন (toxaphene)।

১৯৯৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জেনেভায় বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা উপরোক্ত ১২ টি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক অবিছিন্ন জৈব দূষক (persistent organic pollutants-POPs) নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়ে আলোচনা করার জন্য মিলিত হয়।

তারা ১২ টির মধ্যে মারাত্বকভাবে ক্ষতিকারক ৪ টি যৌগিক যেমন. ক্লোরডেন (chlordane), ডাইলড্রিণ (Dieldrin), হেপ্টাক্লোর (Heptachlor) এবং মিরেক্স (Mirex)এর ব্যবহার সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

তারা একমত হন যে, তারপর ধাপে ধাপে এনড্রিণ (Endrin), এবং টক্সাপেন (toxaphene)জাতীয় জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর যৌগসমূহও নিষিদ্ধ করা হবে।

২০০১ সালে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক জৈব দূষণকারী যৌগ (persistent organic pollutants- POPs) এর উপর স্টকহোম সম্মেলণ অনুষ্ঠিত (Stockholm Convention on Persistent Organic Pollutants) হয়।

ঐ সম্মেলনে ডিডিটিসহ ক্ষতিকারক সকল জৈব দূষক উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধকরণ বা সীমিত করণের সিদ্ধান্ত গৃহিত হয় এবং এতদবিষয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যাতে ১৭০ টিরও বেশী দেশ স্বাক্ষর করে এবং ২০০৪ সাল হতে তা কার্যকর হয়।

বিশ্বব্যাপি জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক জৈব দূষণকারী যৌগসমূহ নিষিদ্ধ করা হলেও ভারতীয় উপমহাদেশ, উত্তর কোরিয়ার, আফ্রিকার দেশগুলোর মত উন্নয়নশীল ও দরিদ্রদেশগুলোর কৃষিতে ও ম্যালেরিয়া দমনে এ গুলো ব্যবহার হয়ে আসছে।

Reference:
1. The GreenPage
2. Book: Environmental Toxicology (Second Edition) -By Ming-Hu Yu
3. WIKIPEDIA

সম্পর্কিত পোস্ট

Green Page | Only One Environment News Portal in Bangladesh
Bangladeshi News, International News, Environmental News, Bangla News, Latest News, Special News, Sports News, All Bangladesh Local News and Every Situation of the world are available in this Bangla News Website.

এই ওয়েবসাইটটি আপনার অভিজ্ঞতা উন্নত করতে কুকি ব্যবহার করে। আমরা ধরে নিচ্ছি যে আপনি এটির সাথে ঠিক আছেন, তবে আপনি ইচ্ছা করলেই স্কিপ করতে পারেন। গ্রহন বিস্তারিত