25 C
ঢাকা, বাংলাদেশ
রাত ৪:৫৯ | ২৩শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ | ৭ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
গ্রীন পেইজ
পরিবেশ দূষণ

একদিকে উচ্ছেদ অভিযান অন্যদিকে বর্জ্য ফেলে চলছে নদী ভরাটের মহা-আয়োজন

বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেলে একসময় বড় বড় স্টিমার, লঞ্চ চলাচল করত। এখন তা পরিণত হয়েছে ময়লার ভাগাড়ে। ময়লা ফেলে ভরাট করা হচ্ছে নদীর দুই পাশ। এরই মধ্যে লোহারপুল অংশে বন্ধ হয়ে গেছে নদীর মুখ। শুধু আদি বুড়িগঙ্গাই নয়, নদীটির মূল চ্যানেল ও তুরাগের দুই পাড়ের সাড়ে তিনশর বেশি জায়গায় ময়লা ফেলে ভরাট করা হচ্ছে নদী। অনেক জায়গায় সীমানা থেকে ৪০ ফুট নদীর ভিতরে বর্জ্যের ভাগাড়ে বেড়ে উঠেছে সাত-আট ফুট লম্বা গাছ। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে দেশের নদ-নদী উদ্ধারে একদিকে চলছে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের অভিযান, অন্যদিকে বর্জ্য ফেলে চলছে নদী ভরাটের মহা-আয়োজন।

গতকাল সরেজমিন বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদ ঘুরে দেখা গেছে বর্জ্য ফেলে নদী হত্যার মহা-আয়োজন। কামরাঙ্গীরচরের দুই পাশ দিয়ে বয়ে গেছে বুড়িগঙ্গার দুটি প্রবাহ। মূল নদী থেকে লোহারপুলের দিকে বুড়িগঙ্গার আদি চ্যানেলে ঢুকতেই নাকে এসে লাগে পচা পানির উৎকট গন্ধ। মুহূর্তে নীলচে পানির রং বদলে হয়ে যায় কালো। কামরাঙ্গীরচরের উল্টো পাশে ইসলামবাগের একই স্থানে অন্তত আধা কিলোমিটার নদীর সীমানাজুড়ে বর্জ্য ফেলে ভরাট করা হয়েছে নদী। দীর্ঘদিন ধরে বর্জ্য ফেলায় নদীর সীমানা থেকে অন্তত ৪০ ফুট নদীর ভিতরে বর্জ্যের ভাগাড়ে জন্মেছে বিভিন্ন গাছ। কয়েকটি গাছ সাত থেকে আট ফুট লম্বা। ময়লা ফেলে ভরাটকৃত জায়গায় বসানো হয়েছে ভাঙাড়ির দোকানপাট। বিপরীত দিকে কামরাঙ্গীরচর অংশেও একই অবস্থা। ফলে সরু হয়ে গেছে চ্যানেল। চ্যানেলটির মুখ থেকে লোহারপুল পর্যন্ত নদীর দুই পাশেই কিছুদূর পর পর এমন ময়লার ভাগাড়। লোহারপুলে গিয়ে বন্ধ হয়ে গেছে নদী। আর এসব আবর্জনা নদীতে পড়ে বিষাক্ত করে ফেলেছে নদীর পানি। পানির রং হয়েছে আলকাতরার মতো কালো। দূষিত হয়ে পড়েছে দুই পাড়ে বসবাসের পরিবেশও। এ ছাড়া কালুনগর, কালুনঘাট, হাজারীবাগ, হাসনাবাদ এলাকায়ও নদীর মধ্যে আবর্জনার স্তূপ দেখা গেছে। মূল চ্যানেলের জিনজিরা প্রান্তে গিয়ে দেখা যায় রসুলবাগসহ পুরো জিনজিরা এলাকায় নদীর পাড়জুড়ে ময়লার ভাগাড়। ঢেকে গেছে নদী রক্ষার সিসি ব্লক। নদীর পাড়ের বাসিন্দাদের সঙ্গে আলাপ করলে তাদের কেউ কেউ বলেন, বর্জ্য ফেলার ব্যবস্থা না থাকায় সবাই নদীতে ফেলে। আবার কেউ কেউ বলেন, প্রথমে ময়লা ফেলে ভরাট করা হয়। এরপর সেখানে বিভিন্ন দোকান বসিয়ে ভাড়া তোলেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। একসময় বড় বড় ভবন তোলা হয়।

বুড়িগঙ্গায় ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে নৌকা চালান মাদারীপুরের সোনা বালি সরদার। তিনি বলেন, এই নদীতে নৌকা চালিয়ে ছয় সন্তানকে মানুষ করেছি। আদি বুড়িগঙ্গাকে চোখের সামনে মরতে দেখেছি। এক যুগ আগেও এই নদীটি কামরাঙ্গীরচর, হাজারীবাগ, বসিলা হয়ে আমিনবাজারের কাছাকাছি গিয়ে আবারও মূল বুড়িগঙ্গার সঙ্গে যুক্ত ছিল। এই নদী দিয়ে সাভার যাওয়া যেত। বর্জ্য ফেলে নদীটির মুখ বন্ধ করে ঘরবাড়ি, দোকানপাট গড়ে উঠেছে। পানির গন্ধে আর নৌকা চালাতে ভালো লাগে না।
এদিকে তুরাগ নদের মিরপুর বেড়িবাঁধ অংশের সিন্নিরটেক এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বিশাল এলাকাটি এখন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অস্থায়ী ডাম্পিং স্টেশন। ময়লার স্তূপ জমতে জমতে ছাড়িয়ে গেছে নদীর সীমানাপ্রাচীর। এতে নদী দূষণের পাশাপাশি চরম দুর্ভোগে এলাকাবাসী। সিটি করপোরেশন বলছে, তাদের কাছে এই মুহূর্তে বিকল্প জায়গা নেই। বড়বাজার এলাকায় গিয়ে পাওয়া গেল দুটি বর্জ্যরে ভাগাড়। তুরাগের পাড় ধরে এগোতে থাকলে বুড়িগঙ্গার মতো ঘন ঘন বর্জ্যের স্তূপ চোখে না পড়লেও টঙ্গী খালে গিয়ে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। দুই পাড়েই বর্জ্য ফেলে ভরাট করা হয়েছে চ্যানেল।

এদিকে মাঠপর্যায়ের জরিপ, জিপিএস মানচিত্র ও স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ করে গত বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বরে বুড়িগঙ্গায় ২৩৭টি ও তুরাগ নদে (টঙ্গী খালসহ) ১৩১টি বর্জ্যের ভাগাড় পেয়েছে জরিপকারী সংস্থা রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার। সংস্থাটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, নদী দখলের প্রথম পদক্ষেপটাই হলো বর্জ্য ফেলা। এরপর সেখানে ছোটখাটো দোকান ওঠে, পরে ভবন ও শিল্প-কারখানা। কাজের অংশ হিসেবে আমরা নিয়মিত নদী পরিদর্শন করি। বর্তমানে বর্জ্যরে ভাগাড়ের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে, কমেনি।

এদিকে ঢাকার নদী উদ্ধারে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের পাশাপাশি নদী খনন, বর্জ্য অপসারণ, সীমানা পিলার স্থাপন, ওয়াকওয়ে নির্মাণে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। গত বছরের ২৯ জানুয়ারি থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত ৬ মাসে ঢাকার তিন নদীর তীর থেকে ৪ হাজার ৭৭২টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে ১২১ একর তীরভূমি অবমুক্ত করে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। পরে আবার দখল হওয়ায় চলতি মাসেও অভিযানে নামে সংস্থাটি। তবে বর্জ্যের হাত থেকে এখনো মুক্ত হয়নি নদ-নদীগুলো। এ ব্যাপারে ঢাকা নদীবন্দরের ইনচার্জ ও বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বর্জ্য আমাদের জন্যও বড় একটা সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা দুর্বল হওয়ায় মানুষ নদীর পাড়ে বর্জ্য ফেলছে। আমরা একদিক দিয়ে পরিষ্কার করে আসছি, ফের বর্জ্যে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এটা ঢাকার বড় সমস্যা। বর্জ্যরে কারণে নদী খননেও সমস্যা হচ্ছে। তবে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ৯০ ভাগই শেষ। এখন খনন করে নদীর গভীরতা ও প্রশস্ততা বৃদ্ধির কাজ চলছে। পুনঃদখল ঠেকাতে মাঝেমধ্যে অভিযান চালাচ্ছি। আদি বুড়িগঙ্গা বিআইডব্লিউটিএর অধীনে নয় জানিয়ে তিনি বলেন, নদীটি রক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে। তবে নদীটি জেলা প্রশাসনের অধীনে। আমাদের হাতে থাকলে চেষ্টা করতাম। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নদীটি উদ্ধার করতে চেয়েছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, বেড়িবাঁধের ওপারে যা আছে সব নদীর জায়গা। আদি বুড়িগঙ্গাকে চ্যানেলে রূপান্তর তথা হাতিরঝিলের মতো করবে বলে একটা প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এতে শত শত অবৈধ দখল বৈধতা পাবে। আদি বুড়িগঙ্গাকে তারা একটি ঝিলে পরিণত করতে চায়। আমরা নদীকে নদী হিসেবে দেখতে চাই। নদীর প্লাবন অঞ্চলের সঙ্গে নদীকে আলাদা করা যাবে না। নদী উদ্ধারের নামে দখলদারদের বৈধতা দেওয়া হচ্ছে। আমাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি আছে। বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকার আশপাশের নদীগুলোকে তারা বর্জ্য ফেলার ড্রেনে পরিণত করেছে। সিটি করপোরেশন নিজেও নদীর পাড়ে বর্জ্য ডাম্পিং করে। কারখানার বর্জ্য তো আছেই। নদীকে দূষণমুক্ত করার বিষয়ে তিনি বলেন, আদালতের রায় যথাযথভাবে মানতে হবে। নদীর সীমানা ঠিকমতো চিহ্নিত করতে হবে। প্লাবন অঞ্চলকে নির্দিষ্ট করতে হবে। নদীর দখলদার উচ্ছেদ করে সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে নদী স্থায়ীভাবে তার স্ট্রাকচার হারাবে। নদী ড্রেনে পরিণত হবে।

এদিকে বুড়িগঙ্গা নদীর পানি দূষণ বন্ধে হাই কোর্টের দেওয়া রায় বাস্তবায়ন না করায় ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খানকে গত ১৪ সেপ্টেম্বর সতর্ক করে এক মাসের মধ্যে আদালতে প্রকৃত রায় বাস্তবায়নের প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্ট। সূত্র: বিডি-প্রতিদিন

সম্পর্কিত পোস্ট

Green Page | Only One Environment News Portal in Bangladesh
Bangladeshi News, International News, Environmental News, Bangla News, Latest News, Special News, Sports News, All Bangladesh Local News and Every Situation of the world are available in this Bangla News Website.

এই ওয়েবসাইটটি আপনার অভিজ্ঞতা উন্নত করতে কুকি ব্যবহার করে। আমরা ধরে নিচ্ছি যে আপনি এটির সাথে ঠিক আছেন, তবে আপনি ইচ্ছা করলেই স্কিপ করতে পারেন। গ্রহন বিস্তারিত